ভৌগোলিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভাটি অঞ্চলে। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। এ সময় কিছু অঞ্চলে বন্যার পাশাপাশি ভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশ্য শুষ্ক মৌসুমে বেশির ভাগ নদ-নদীই থাকে প্রায় পানিশূন্য। বর্ষা মৌসুম আসতে এখনো মাসখানেক বাকি থাকলেও সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে সুরমা নদীর সিলেট সদর উপজেলা অংশের মোগলগাঁও ও কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বালাগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদীতেও ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। গত সপ্তাহে নতুন করে ডেবে গেছে একটি সেতু, ভেঙে পড়েছে রাস্তা। আরো ১০-১৫টি ঘরবাড়ি বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে নদীর তীরবর্তী গ্রাম বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নের চানপুর, যোগীরগাঁও, লালারগাঁও, তালুকপাড়া, খালপাড়, মিরেরগাঁও, ফতেহপুর, ফুলকুচি, পিরেরগাঁও, আকিলপুর ও নোয়াগাঁওয়ের একাংশে সুরমা নদীর তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিতে পড়েছে এসব গ্রামের ঘরবাড়ি, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চানপুর ঐতিহ্যবাহী গ্রাম ছিল। সুরমার ভাঙনে ধীরে ধীরে গ্রামটি নিশ্চিহ্ন হতে চলছে। ভাঙন রোধে ব্লক বা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে ঘুরছেন জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। কিন্তু কোনো কাজে আসছে না। নদীভাঙনপ্রবণ গ্রামগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে না কেউ।
চানপুর গ্রামের বাসিন্দা রুফিয়া বিবি বলেন, ‘নদীর পাড়ে আমাদের বাড়ি ছিল। সব বিলীন হয়ে গেছে। অল্প জায়গায় যে ঘর রয়েছে সেটিও নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। ঘরটি ভেঙে গেলে আমাদের আর যাওয়ার জায়গা থাকবে না।’
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। নদীর পানি যত বাড়ছে, তত আতঙ্ক বাড়ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’
কান্দিগাঁও ইউনিয়নের হেরাখলা গ্রামটি নদীভাঙনে এখন দুই ভাগে বিভক্ত। অব্যাহত ভাঙনের ফলে ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে সুরমার অন্য পাড়ে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়েছে হেরাখলা গ্রামটিও।
হেরাখলা গ্রামের মখলিছুর রহমান বলেন, ‘নদীভাঙন আমাদের অনেককে গৃহহীন করেছে। স্বজনরা একে অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হচ্ছে। দুই বছর আগে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেয় এলাকাটিতে। এখন প্রতি বছরই ভাঙছে নতুন নতুন এলাকা।’
একই গ্রামের বাসিন্দা আরমান আলী জানান, গ্রামের একমাত্র মসজিদটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে তারা একসময় নিঃস্ব হয়ে পড়বেন।
কান্দিগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম দর্শা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ জানান, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের চেষ্টায় পশ্চিম দর্শা এলাকায় এক কিলোমিটার ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। ওই এলাকা রক্ষা পেলেও বাকি এলাকা এখনো ভাঙনকবলিত। দিন দিন ভাঙন বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে হেরাখলা গ্রামটি বিলীন হওয়ার পথে।
কান্দিগাঁও ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘হেরাখলা গ্রামের মানুষ হতদরিদ্র। নদীভাঙনে গ্রামের অবশিষ্ট পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু রক্ষা করা যাচ্ছে না। অবিলম্বে ব্লক বসানো প্রয়োজন। না হলে হেরাখলা গ্রামের শেষ অংশটুকুও সুরমায় বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মনাফ জানান, তার ইউনিয়নের বেশকিছু গ্রাম সুরমা নদীর তীরবর্তী। হেরাখলা ছাড়াও ধনপুর, জাঙ্গাইল এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গ্রামের মানুষের পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তিনিও যাচ্ছেন।
সম্প্রতি মোগলগাঁও ইউনিয়নের যোগীরগাঁও অংশে নদীভাঙনে বেশকিছু পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। ওই গ্রামের মো. আব্দুর রউফ, মোহাম্মদ আজির উদ্দিন, বাবুল মিয়া ও আব্দুল আলিমকে আশ্রয় নিতে হয়েছে অন্য গ্রামে । আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পলাতক রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চেয়ারম্যান তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও ১৫-১৬ বছরে কিছুই হয়নি।
শুধু সুরমা নয়, বালাগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদীতেও ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। কয়েক বছর ধরে চলা ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি। গত সপ্তাহে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ডেবে গেছে একটি সেতু, ভেঙে পড়েছে রাস্তা। আরো ১০-১৫টি ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, তিন-চার বছরে নদীভাঙনে পৈলনপুর ও ফাজিলপুর গ্রামের ২০টি ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। সম্প্রতি পৈলনপুর ও ফাজিলপুর গ্রামের মধ্যবর্তী অংশটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। এতে ওই অংশের অন্তত ৩০০ মিটার রাস্তা ভেঙে গেছে। সেখানে থাকা একটি সেতু পুরোপুরি ডেবে গেছে।
ফাজিলপুর গ্রামের বাসিন্দা নূরুল আফসার বলেন, ‘সড়ক যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।’
সার্বিক বিষয়ে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুরমা নদীর সিলেট সদর অংশে ভাঙনের খবর পুরনো। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। যেসব জায়গা বেশি ভাঙনপ্রবণ সেখানে বর্ষার আগে জিও ব্যাগ দেয়া হবে। তাতে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে।’
কুশিয়ারার নদীর বাঁধ সংস্কারের বিষয়ে প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘সংস্কারকাজের জন্য তিনবার ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু জিও ব্যাগ প্রস্তুতে বালির অপ্রতুলতায় ঠিকাদার কাজ করতে পারছিলেন না। এখন পুনরায় ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে ঠিকাদার নিয়োগে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।










