জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ৩১ কিলোমিটার খাল পুনরায় খনন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এর মধ্যে উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নে দুই কিলোমিটার খাল খনন করা হচ্ছে। স্মল হোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্টের (এএসসিপি) কাজে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরদার এন্টারপ্রাইজ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। নকশা অনুযায়ী খালের জমি ২০ ফুট চওড়া। কার্যাদেশে খালটি2২৫-৩৩ ফুট প্রশস্ত ও ১০ ফুট গভীর করার কথা। তবে ৭০ ফুট প্রশস্ত করে খনন করা হচ্ছে। এতে আশপাশের কৃষিজমি, খালের পাড়ে থাকা বসতভিটা ও গাছপালা কাটা পড়ছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, খালের সীমানা নির্ধারণ, কোনো ধরনের নোটিস ও ক্ষতিপূরণ ছাড়াই খাল খনন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জমি কেটে নেয়া হচ্ছে। ৪ মে ৮৬ জনের স্বাক্ষরসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তারা।

খইয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খইয়াছড়া গ্রামের আনোয়ারা বেগম এক বছর আগে খালের পাশে ছয় শতক জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। ওই জমি কিনতে অন্যের বাড়িতে ২৫ বছর ধরে কাজ করতে হয়েছে তাকে। খাল সংস্কার করতে গিয়ে তার প্রায় তিন শতক জমি কেটে ফেলা হয়েছে।

খইয়াছড়া গ্রামের বাসিন্দা হাসিনা আক্তার বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর আগে আমি, মঞ্জুরা বেগম ও আবুল কাশেম মিলে ১৫ শতক জমি কিনে বসবাস শুরু করছি। সম্প্রতি খাল খনন করতে গিয়ে আমাদের অর্ধেক জমি কেটে ফেলেছে। ভারি বৃষ্টি হলে আমাদের বাড়িও খালের মধ্যে চলে যাবে। কমপক্ষে অর্ধশতাধিক দরিদ্র পরিবার অল্প টাকায় খালের পাড়ে জমি কিনে বাড়ি করে এখন বিপাকে পড়েছে। কোনো নোটিস কিংবা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাদের বসতভিটা, আশপাশের কৃষিজমিতে খাল খনন করছে বিএডিসি। খনন করতে গিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে শত শত গাছ।’

প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে খাল খনন করতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন বরাবর জসীম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, খালটির বিএস দাগ নং ১০৬৮৯। আগেও খালটিতে খননকাজ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার কোনো সীমানা নির্ধারণ না করে খনন করতে গিয়ে আশপাশে থাকা কৃষিজমি, বসতভিটা, চলাচলের রাস্তা ও শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। নোটিস কিংবা কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই এ কাজ করা হচ্ছে।

জসীম উদ্দিন বলেন, ‘নকশা অনুযায়ী খালের জমি ২০ ফুট চওড়া। কার্যাদেশ রয়েছে খালটি ৩৩ ফুট প্রশস্ত ও ১০ ফুট গভীর করে খনন করতে হবে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭০ ফুট প্রশস্ত করে খাল খনন করছে। এতে কৃষিজমি, খালের পাড়ে থাকা বসতভিটা, গাছপালা কাটা পড়ছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ঠিকাদারের লোকজন ও বিএডিসির কর্মকর্তারা সরকারি কাজের দোহাই দিয়ে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

এ ব্যাপারে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাল খনন নিয়ে খইয়াছড়া ইউনিয়ন থেকে একটি অভিযোগ পেয়েছি। খাল খননের কারণে সাধারণ মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে কাজ করতে বিএডিসির কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ খাত থেকে মিরসরাই উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার আটটি খাল খনন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ১৫ কিলোমিটার খনন করা হবে। পরে ক্রমান্বয়ে প্রায় ৩১ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন করা হবে। প্রতি কিলোমিটার খাল খননের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। জুনের মধ্যে খালগুলোর খননকাজ শেষ করার কথা রয়েছে। এর মধ্যে খইয়াছড়া ইউনিয়নের খইয়াছড়া গ্রামে খনন করা হবে দুই কিলোমিটার।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, খইয়াছড়া গ্রামের খালটি প্রশস্ত করার কথা ১০ মিটার বা ৩০ ফুট, গভীর হওয়ার কথা তিন মিটার বা নয় ফুট। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খননের মাটিগুলো দিয়ে ব্যক্তিগত জায়গায় পাড় তৈরি করছে। এ কারণে খালটি ৭০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বিএডিসি চট্টগ্রাম জোনের সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাল খননের সময় বিভিন্ন স্থানে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সমস্যাগুলোর বিষয়ে জানতে পারলে ঘটনাস্থলে গিয়ে আবার খনন শুরু করা হবে। তবে খাল খনন শেষ হলে উপজেলার অন্তত দুই লাখ মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবে।’