ঋণ পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে যাওয়ায় দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারের শীর্ষস্থানীয় কনগ্লোমারেট হিসেবে পরিচিত সিটি গ্রুপের ঋণ স্থিতি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দেশী-বিদেশী প্রায় ৪৭টি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে নেয়া এ ঋণের স্থিতি এরই মধ্যে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। তবে শিল্প গ্রুপটি যাতে তাদের সমস্যা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুবিধার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে।

সিটি গ্রুপকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী ও গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিটি গ্রুপের বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতি, ঋণ আদায় প্রক্রিয়াসহ সামগ্রিক বিষয়ে পর্যালোচনা হয় বলে জানা গেছে।

সভায় অংশ নেয়া একাধিক সূত্র জানায়, সিটি গ্রুপের বিষয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়। এর মধ্যে রয়েছে এখনই গ্রুপটির ঋণ খেলাপি না করে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা; গ্রুপটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আরো দুই-আড়াই হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয়া। এক্ষেত্রে দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়েও গ্রুপটিকে পরামর্শ দেয়া হয়।

সভায় গভর্নর ছাড়াও ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন, ঋণদাতা ব্যাংকের মধ্যে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের এমডি ফয়সাল রহমান, পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী, ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশিদ, ব্যাংক এশিয়ার এমডি সোহেল আর কে হুসেইন, সাউথইস্ট ব্যাংকের এমডি খালিদ মাহমুদ খানসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানও সভায় অংশ নেন। মূলত গ্রুপটির বিশেষ অনুরোধেই ওই সভার আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

সভায় অংশ নেয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিটি গ্রুপের ঋণ স্থিতি এখন ২৬ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ হলেও প্রতি বছর নতুন করে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার সুদ যুক্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রুপটিকে টিকে থাকতে হলে দ্রুত ঋণস্থিতি কমাতে হবে।’

ভোজ্যতেল ও চিনি পরিশোধন, চাল-ডাল, আটা-ময়দা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, পোলট্রি খাদ্য, জাহাজ নির্মাণ, চা বাগান, ব্যাংক ও বীমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে সিটি গ্রুপের ব্যবসা বিস্তৃত। তিনটি ইকোনমিক জোনসহ একটি হাই-টেক পার্কও রয়েছে গ্রুপটির।

শিল্প গ্রুপটি নিয়ে গত ৬ মে বণিক বার্তায় ‘আর্থিক চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তা চাইল সিটি গ্রুপ’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠার পর ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা সিটি গ্রুপ আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ও স্থানীয় নানা সংকটের কারণে গ্রুপের কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নীতিসহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করে গ্রুপটি। আবেদনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ (খেলাপি) না করাসহ সাত ধরনের নীতিসহায়তা চাওয়া হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় ওই সভার আয়োজন করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে অংশ নেয়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সিটি গ্রুপের বিষয়ে আমরা এখনো ইতিবাচক। আমরা চাই গ্রুপটি ঘুরে দাঁড়িয়ে আগের মতো ব্যবসা করুক। ভালো গ্রাহক হিসেবে এখনো সব ব্যাংকই তাদের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। সভায় গ্রুপটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। তাদের বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ এসেছে। আশা করছি, গ্রুপটি সেসব পরামর্শ আমলে নিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।’