দেশের বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু রয়েছে সান্ধ্য কোর্স। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এর নাম দেয়া হয়েছে ‘উইকেন্ড’ কোর্স। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত এসব কোর্সের শিক্ষার্থীরা মূলত বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং জাতীয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। এ কোর্স থেকে বছরে উপার্জন প্রায় ২০ কোটি টাকা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী, সব ধরনের হিসাব বার্ষিক বাজেটে থাকার কথা থাকলেও প্রতি বছরই এ কোর্সের আয়-ব্যয়কে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে উইকেন্ড কোর্স থেকে গত পাঁচ অর্থবছরে শতকোটি টাকা আয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে দেখানো হয়নি।

জানা যায়, জাবিতে সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে অর্থাৎ শুক্রবার একটি কোর্স চালুর জন্য ২০১১ সালে অনুমতি দেন তত্কালীন উপাচার্য ড. শরীফ এনামুল কবির। কেবল ছুটির দিন ক্লাস-পরীক্ষা চলায় এর নাম দেয়া হয়েছে ‘উইকেন্ড’ কোর্স। এরপর পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট বিভিন্ন মেয়াদে এসব সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে। উইকেন্ড কোর্স নিয়ে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক উদ্দেশে চালু হওয়া এসব কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণাকাজে ব্যাঘাত ঘটছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ১৫টি বিভাগ ও দুটি  ইনস্টিটিউটে বাণিজ্যিক এ কোর্স চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, রসায়ন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ভূগোল, সরকার ও রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইংরেজি, লোকপ্রশাসন, ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট এবং আইবিএ ও আইআইটি ইনস্টিটিউট। সাধারণত এক বছরে তিনটি সেমিস্টারে সাপ্তাহিক এসব কোর্সের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয় বিভাগগুলো। ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) ও ইংরেজি বিভাগ অবশ্য দুই বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য না রাখায় সুনির্দিষ্টভাবে এসব কোর্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানা যায়নি। যদিও কোর্স-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংখ্যাটা দুই হাজারের কম হবে না। আর প্রতি শিক্ষার্থীকে এসব কোর্সের ফি গুনতে হয় ৮০ হাজার থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। যেখান থেকে প্রতি অর্থবছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় হয়, যার ৫০ শতাংশ অর্থ কোর্স পড়ানোর সম্মানী হিসেবে শিক্ষকেরা নিয়ে থাকেন। এছাড়া ৪০-৫০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদের কল্যাণ, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।

খোঁজ নিয়ে অবশ্য জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উইকেন্ড কোর্সের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে রয়েছে নানা রকম ধোঁয়াশা। কোর্স থেকে গত পাঁচ অর্থবছরে প্রায় শতকোটি টাকা আয় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে দেখানো হয়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, আয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য মাসে ১ লাখ, দুই উপ-উপাচার্য ৫০ হাজার করে, কোষাধ্যক্ষ ৩৫ হাজার ও রেজিস্ট্রার ২৫ হাজার টাকা সম্মানী নেন। এ হিসাবে বছরে তারা নেন ৩১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস, কম্পট্রোলার অফিস ও অভ্যন্তরীণ অডিট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দেয়া হয় আয়ের একটি অংশ। তবে বাকি অর্থ অন্য কোন খাতে ব্যয় হয়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা অধিদপ্তরের করা নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও জাবির উইকেন্ড কোর্সের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে ধোঁয়াশার বিষয়টি উঠে এসেছে। নিরীক্ষা দলের কাছে এ নিয়ে তথ্য গোপন করায় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ লঙ্ঘনেরও অভিযোগ আনা হয়েছে গত এপ্রিলে পাঠানো তাদের প্রতিবেদনে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জাবির সান্ধ্য (উইকেন্ড) কোর্সের দায় যথাক্রমে ৭৫ লাখ, ৩৪ লাখ, ৮৬ লাখ, ৪৯ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা ২০২০ সালের জুনের বার্ষিক হিসাবে দেখানো হয়েছে। তার অর্থ হলো কোর্সের আয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সেই টাকা ‘ধার’ নিয়েছে। কিন্তু বার্ষিক বাজেটে কোর্সগুলো থেকে মোট কত টাকা আয় হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের স্মারক নং-বিমক/বাজেট-৪/২০১৭-৩৯৭১ তারিখের শর্ত ১১ মোতাবেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আয় বার্ষিক বাজেটে প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে নিরীক্ষা দলের চাহিদাপত্র নং-(১) শিঅঅ/নিরীক্ষা (দ্বিতীয় পর্ব)/২০২০-২১/দল-০৯/০১, ৩ ও ৪ মূলে সান্ধ্য কোর্সগুলোর তথ্য বারবার চাওয়া হলেও নিরীক্ষায় উপস্থান করা হয়নি। এজন্য কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল ফাংশন্স অ্যাক্টস ১৯৭৪-এর ধারা ৫-এর নির্দেশনা-১-এর লঙ্ঘন।

অডিটকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবে বলা হয়, জাবির বিভিন্ন বিভাগ, অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের পরিচালিত উইকেন্ড কোর্সের আয় ও ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব বাজেটভুক্ত নয়। প্রোগ্রামগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অধ্যাদেশ বা নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। হিসাবে দেখানো আয় রাজস্ব বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম থেকে ধার নেয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়নি অডিট টিম। তারা এ কোর্স থেকে প্রাপ্ত আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে উল্লেখ করার কথা বলেছেন।

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, সান্ধ্য কোর্সের আয় ও ব্যয়ের হিসাবের তথ্য প্রস্তুতের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তথ্য প্রক্রিয়াকরণ শেষ হলে খুব দ্রুতই জানানো হবে।