তীব্র দাবদাহ ও বৃষ্টিপাত না হওয়ায় চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আসন্ন আউশ মৌসুমে আবাদে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক পূরণ নিয়ে সংশয়ে আছেন কৃষক। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আবাদ দেরিতে শুরু হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিজমিতে পানি সংকট, তীব্র তাপদাহ, বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আউশ ধানের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন না কৃষক। আগাম ১৫ জুনের আগেই আবাদ মৌসুম শেষ হতে চললেও ৬ জুন পর্যন্ত এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫ হেক্টরের মধ্যে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার ২৯৬ হেক্টর বা ৩০ শতাংশ জমি। ১৫ জুনের মধ্যে আবাদের সুযোগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাকি ৭০ শতাংশের আবাদ নিয়ে শঙ্কায় আছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার ৫০ শতাংশ জমিতে আবাদ না হওয়ার আশঙ্কা আছে। যদি এ রকম হয় তাহলে দেশের আউশ মৌসুমে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে ধান আবাদে আগ্রহী নন বলে জানান কৃষক।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি আবাদ বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আবাদের সময়কালে অতিরিক্ত তাপদাহ, বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানির সংকট বেড়ে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট দেখা দেয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ পর্যাপ্ত না থাকায় কৃষক আউশ আবাদের সময় তাদের জমি অনাবাদি রেখে দিচ্ছেন। আবার যারা ধান আবাদ করেছেন সেখানে পানির সংকটের কারণে অনেক ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার এ বিরূপ আচরণের কারণে দেশে আউশ মৌসুমে ধান উৎপাদনে বড় সংকটের মুখে পড়বে বলে মনে করেন তারা।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর) আউশ ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫ হেক্টর, যা গত অর্থবছর থেকে প্রায় ১৪ হাজার ৮৩৬ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে উফশী ১ লাখ ২১ হাজার ৫৩৫ হেক্টর, স্থানীয় ১০ হাজার ৩৫০ ও হাইব্রিড জাতের ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ হেক্টর। এ অঞ্চলে স্থানীয় জাতের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৭০০ হেক্টর কমানো হলেও উফশী জাতটি ১৫ হাজার ৩৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাতটির আবাদ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ১ হাজার ১০০ হেক্টর। এছাড়া চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার ৪৩টি উপজেলার ৯৭ হাজার কৃষককে ৫ কোটি ৫৫ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয়েছে।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলায় চলতি মৌসুমে ৪০ হাজার ২৩৪ হেক্টর জমিতে আউশ ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছর থেকে ৪ হাজার ৩০ হেক্টর বা ১০ শতাংশ বেশি। সর্বশেষ ৬ জুন পর্যন্ত জেলায় আবাদ হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে। ২৯ হাজার ২৩৬ হেক্টর উফশীর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬১০ হেক্টর। তবে স্থানীয় জাতের ধান ৩ হাজার ১৯৫  এবং হাইব্রিড ধান আবাদ হয়েছে ৬ হাজার ১০০ হেক্টরের মধ্যে মাত্র ১৫ হেক্টরে। অর্থাৎ জেলাটিতে প্রায় ৮৮ শতাংশ জমির ধান আবাদ বাকি।

কক্সবাজার জেলায় আউশ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৯৭ হেক্টর, যা গত বছর থেকে ৭৯৭ হেক্টর বেশি। এ জেলায় এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪ হেক্টর জমিতে উফশী জাতের ধান আবাদ হয়েছে। ফেনী জেলায় চলতি মৌসুমে ১০ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ১৬২ হেক্টর জমি বা ৩৯ শতাংশ। গত মৌসুমে এ জেলা থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমির আউশ জাতের ধান কাটা হয়। জেলাটিতে এখনো ৬১ শতাংশ জমিতে আবাদ বাকি। ৯ হাজার ২৬০ হেক্টর উফশী জাতের ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৬ হেক্টর। বাকি জমির মধ্যে ৪৫০ হেক্টর স্থানীয় জাত ও ৩৬ হেক্টর হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ হয়েছে।   

এদিকে নোয়াখালী জেলায় সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার ৮৯ হেক্টর জমিতে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে জেলাটিতে ১৭ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। জেলাটিতে এখনো প্রায় ৬২ শতাংশ জমিতে আবাদ বাকি। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে নোয়াখালীতে আউশ আবাদের পরিমাণ এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। গত বছর এ জেলায় আবাদ হয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। লক্ষ্মীপুর জেলায় ৩৫ হাজার ৬০৫ হেক্টরের মধ্যে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ১৪ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে। গত বছর এ জেলায় ৩৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছিল।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কৃষক মো. মাসুম জানান, বোয়ালখালীতে চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত তেমন হয়নি। আমার প্রায় ১৮ গণ্ডা (১ গণ্ডা=২ শতক) ধানি জমির মধ্যে অর্ধেকেও ধান লাগাতে পারিনি। কয়েকদিনে মধ্যে যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় তাহলে কিছু জমিতে ধান লাগানোর ইচ্ছা আছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. অরবিন্দু কুমার রায় বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আউশ মৌসুম বৃষ্টিনির্ভর হয়ে থাকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে কৃষক ধান আবাদ করতে পারেননি। আউশ মৌসুমে সেচ দিয়ে জমিতে ধান চাষ করতে পারবেন না কৃষক। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় কেউ আগ্রহ দেখালেও সেটা পারছেন না। যার কারণে আউশ মৌসুমে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয়নি। আমাদের হাতে আরো কিছু সময় আছে। যদি এর মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় তাহলে আরো আবাদের সম্ভাবনা আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে ক্ষতি বাড়ছে।’