নাটোরের লালপুরে থানা হেফাজতে আসামি নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। অটোরিকশা ছিনতাইয়ের একটি মামলায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি না হওয়ায় গ্রেফতার চার আসামির মধ্যে তিনজনকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ ঘটনায় লালপুর আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোসলেম উদ্দীন গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য নাটোর পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করার জন্য ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়ারও আদেশ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা হলেন বড়াইগ্রাম সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজিব, লালপুর থানার ওসি মো. উজ্জ্বল হোসেন, এসআই জাহিদ হাসান, ওমর ফারুক ও এক কনস্টেবল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, লালপুর থানার পুলিশ অটোরিকশা ছিনতাই মামলায় পাবনার ঈশ্বরদীর ফতেহ মোহাম্মদপুর গ্রামের মো. সোহাগ (৩০), মোকাররমপুর গ্রামের মো. সালাম (৩১), নাটোরের বড়ইগ্রামের নগর গ্রামের মো. শামীম মোল্লা (২৯) ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বারাদি গ্রামের রাকিবুল ইসলামকে (৩০) গ্রেফতার করে। বুধবার তাদের লালপুর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। আসামিরা আদালতের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবদুল্লাহ বিশ্বাস বলেন, ‘আসামিদের মধ্যে সোহাগ হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুক। তিনি অন্য আসামিদের জেলহাজতে পাঠানোর জন্য উপস্থাপন করেন। এ সময় চার আসামির মধ্যে রাকিবুল ইসলাম বাদে তিনজনই থানায় পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ করেন।’
সোহাগ হোসেন আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ‘৯ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে উত্তর লালপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। থানায় আসার পরপরই ওসি উজ্জ্বল হোসেন তাকে চোখ বেঁধে মারধর শুরু করেন। তারপর ১১ জুলাই থানা হেফাজতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরিফ আল রাজিব তাকে বলেন, যদি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকার না করেন, তাহলে তাকে রিমান্ডে নেবেন। তারপর এমন মামলা দেবেন যাতে আর কোনো দিন বউ-বাচ্চার মুখ দেখতে না পারেন।’
অন্য আসামি মো. সালাম তার জবানবন্দিতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশ ৯ জুলাই রাত ১টার দিকে তাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানোর পর ভোর ৫টার দিকে থানায় নিয়ে আসে। পরদিন ১০ জুলাই ওসি থানায় ঢুকেই থাপ্পড় মারতে থাকেন। তারপর থানার উপর তলায় নিয়ে এসআই জাহিদ হাসান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুক তার কনিষ্ঠ আঙুলের ওপর টেবিলের পায়া রেখে চাপ দিতে থাকেন। এতে তার তিনটি আঙুলে মারাত্মক ক্ষত হয়। এভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়।
আরেক আসামি শামীম মোল্লাও অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ তাকে ১০ জুলাই রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাড়ি থেকে তুলে নেয়। তারপর রাস্তায় মারতে মারতে থানায় নিয়ে আসে। তার ওপরও অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের বক্তব্য ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নাটোরের জেল সুপার ও আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ককে নির্দেশ দেন। আসামিদের শরীরে থাকা জখমের কারণ এবং জখমের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিয়ে মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রস্তুত করে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টার মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করার নির্দেশ দেন আদালত। নাটোর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সামিউল ইসলাম বৃহস্পতিবার আদালতে সে প্রতিবেদন দেন। চিকিৎসকের দেয়া প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অভিযোগকারী তিন আসামির মধ্যে সালাম ও শামীম মোল্লার শরীরে নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পান আদালত। অন্য আসামি সোহাগের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন নেই বলে চিকিৎসক প্রতিবেদন দিয়েছেন।
এ বিষয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান বলেন, ‘অটোরিকশা ছিনতাই মামলার আসামিদের ধরার সময় তারা দৌড়ে পালাতে গেলে কিছু দাগটাগ হয়েছে। পরে তারা আদালতে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। আদালতের আদেশের কথা শুনেছেন। আদেশের কপি পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










