বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়ার ক্ষেত্রে ঋণপত্রে (এলসি) নতুন ধারা যুক্ত করছেন ক্রেতারা, যেখানে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গটি। আর এটিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ায় ঋণপত্রের ধারা নিয়ে সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এতে করে বিপাকে পড়তে হচ্ছে রফতানিকারকদের। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাড়তি সতর্কতার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণপত্র গ্রহণের বিষয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। সৃষ্টি হয়েছে ক্রয়াদেশ হারানোর মতো পরিস্থিতিও।

পোশাক পণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে পোশাক কারখানা মালিকদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা করেন। ক্রেতারা ঋণপত্রে শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন বলে ওই সভায় উপস্থিত মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়। পরে বিষয়টি অবহিত করা হয় গণমাধ্যম কর্মীদেরও।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি বিদেশী ক্রেতার পাঠানো একটি লেটার অব ক্রেডিটের (এলসি) অনুলিপি তাদের নজরে এসেছে। সংগঠনটির এক সদস্যকে পাঠানো সে এলসির ধারায় উল্লেখ রয়েছে—‘আমরা জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত কোনো দেশ, অঞ্চল বা দলের সঙ্গে লেনদেন প্রক্রিয়া করব না। নিষেধাজ্ঞার কারণগুলোর জন্য আমরা কোনো বিলম্ব, নন-পারফরম্যান্স বা তথ্য প্রকাশের জন্য দায়ী নই।’

এদিকে ঋণপত্রের ওই ধারাটি আলোচনায় আসতেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয় থেকেও ধারাটির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা সাপেক্ষে ঋণপত্র গ্রহণের দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে রফতানিসংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশী এক বায়িং হাউজ ৬ ডিসেম্বর পোশাকের একটি ঋণপত্র পায়। তাতে স্যাংশন-সংক্রান্ত একটি ধারা যুক্ত রয়েছে। তবে ধারাটি নতুন নয়, ২০২২ সাল কিংবা তার আগেও ঋণপত্রে তা যুক্ত ছিল। যেগুলো গ্রহণের পর পণ্য জাহাজীকরণ হয়ে অর্থও পরিশোধ হয়েছে। কিন্তু ৬ ডিসেম্বরের ঋণপত্রের খসড়া সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে দেয়া হলে রফতানিকারককে ধারাটি তুলে নেয়ার শর্ত দেয়া হয়। পরে ব্যাংকের ওই বার্তা ক্রেতাকে দেয়া হলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ ধরনের ধারাযুক্ত ঋণপত্র দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ চলছে। নতুন করে এখন কেন সেটি তুলে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে? পাশাপাশি ক্রেতার পক্ষ থেকে এও জানানো হয় যে পণ্য আমদানিকারক ঋণপত্রে এ ধারা যুক্ত করেনি, সেটি করেছে মূলত ইউরোপীয় ওই আমদানিকারকের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। তাই ধারাটি কোনোভাবেই তুলে নেয়া সম্ভব নয়।

জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বায়িং হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাজুল ইসলাম ১৩ ডিসেম্বর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৬ ডিসেম্বর ঋণপত্র পাওয়ার পরপরই কারখানা কর্তৃপক্ষ বা রফতানিকারকের কাছে তা খসড়া হিসেবে দেয়া হয়। সেটি যাচাই-বাছাই করে রফতানিকারকের ব্যাংক স্যাংশন-সংক্রান্ত ধারাটি তুলে নিতে বলে। তার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ব্যাংকের পক্ষ থেকে। তারা জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট কিছু ধারা যুক্ত থাকলে বিজিএমইএর পক্ষ থেকেই ঋণপত্র গ্রহণ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সে কারণেই এ পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে ব্যাংক।’ তবে গতকাল তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, রফতানিকারক ও ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ঋণপত্রটি গ্রহণে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

তাজুল ইসলামের জটিলতাটির সমাধান হলেও সতর্কতাস্বরূপ ব্যাংকগুলো এখন ঋণপত্রে থাকা ধারাগুলো যাচাই-বাছাইয়ে অনেক বেশি সচেতনতা অবলম্বন করছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির পক্ষ থেকে এমন একটি সার্কুলার বণিক বার্তার হাতে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি লক্ষ্য করা গেছে যে পোশাকের কিছু খুচরা বিক্রেতা প্রতিকূল ধারাসহ আমাদের দেশের পোশাক রফতানিকারকদের পক্ষে রফতানি এলসি/বিক্রয় চুক্তি জারি করেছে। এ বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে কোনো প্রতিকূল ধারাসহ রফতানি এলসি/বিক্রয় চুক্তির আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করুন।’

ব্যাংকটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাদের শাখাগুলোকে দুটি ব্যবস্থা অনুসরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রথমটি হলো সব রফতানি এলসি বা বিক্রয় চুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। তাতে কোনো প্রতিকূল ধারা পাওয়া গেলে, এর বিপরীতে যেকোনো ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু করার জন্য সংশ্লিষ্ট এবং প্রযোজ্য বিভাগ থেকে কেস টু কেস ভিত্তিতে পূর্ব অনুমতি নেয়া। দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি হলো ক্লায়েন্টদের অনুরোধের ক্ষেত্রে এ ধরনের রফতানি এলসি বা বিক্রয় চুক্তির জন্য; আবেদনকারী এবং সুবিধাভোগীর সহযোগিতায় প্রতিকূল ধারায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা করা। কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় সংশোধনী বা প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে গৃহীত অনুমোদনের আগে এ ধরনের রফতানি এলসি বা বিক্রয় চুক্তিতে না যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সার্কুলারে। 

জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি শামীম আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অ্যাডভার্স ক্লজের এলসির জন্য যেন সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় সেদিকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। ঋণপত্রে এ ধরনের ক্লজ আগেও ক্রেতার পক্ষ থেকে দেয়া হতো। তবে সম্প্রতি অ্যাডভার্স ক্লজের ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি নিতে বলা হয়েছে। আমরা কোনো কিছু করতে মানা করিনি। আমাদের ব্যাংকের বিদ্যমান অনেক কাস্টমার এ ধরনের অ্যাডভার্স ক্লজ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই ব্যবসার কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। আমাদের কাস্টমার এবং তাদের ক্রেতার স্ট্রেংথ অনুযায়ী আমরা কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যাই।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শামীম আহম্মদ আরো বলেন, ‘অ্যাডভার্স ক্লজের ঋণপত্র বা কন্ট্র্যাক্টটির বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খুলছে ব্যাংক। কোনো কারণে যদি ক্রেতার পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধ না হয় তাহলে ব্যাক টু ব্যাকের দায় ব্যাংককেই নিতে হয়। এ কারণেই ব্যাক টু ব্যাক করার আগে যেন সতর্কতার সঙ্গে ক্লজগুলো দেখে নেয়া হয়, যাতে করে রফতানিকারক ও ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর সেটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের শাখাগুলোকে। আমরা কোনো ঋণপত্র কার্যক্রম থামিয়ে রাখতে বা গ্রহণ না করতে বলিনি। এমনকি ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনদের মৌখিকভাবেও বলা হয়েছে যে সতর্কতা অবলম্বনের ক্ষেত্রে যেন কোনো প্যানিক সৃষ্টি না হয়।’ 

ব্যাংকের এ সতর্কতামূলক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে বিজিএমইএ। তবে যাচাই-বাছাই যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানিকারকের বিড়ম্বনা বা বিপাকে পড়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই আমাদের অবস্থানটা পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রথমেই যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো আমাদের দেশের ওপর কোনো স্যাংশন নেই। আমি দৃঢ়ভাবে বলছি যে স্যাংশন আসার কোনো কারণ ও সম্ভাবনাও নেই। শ্রম আইন অনুসরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে এমন দেশের সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি ক্রেতা স্যাংশন সম্পর্কিত কোনো ক্লজ ব্যবহার না করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ব্যবহার হলে আমরা মেনে নেব না। এরই মধ্যে যে ক্রেতার পক্ষ থেকে এ ধরনের ক্লজযুক্ত ঋণপত্র পাওয়া গেছে সেটা তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি তারা এও বলেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্লজ ঋণপত্রে দেয়া হবে না।’

স্যাংশন সম্পর্কিত কোনো ক্লজ যদি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই কেবল ব্যবহার করা হয়, সে ঋণপত্রের মাধ্যমে ক্রয়াদেশ না নেয়ার জন্য সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এর জন্য ক্রয়াদেশ কম হতে পারে কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত থাকা যায়। আগেও এ ধরনের ক্লজ ব্যবহার হতো, যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পর্কিত স্যাংশন ক্লজ ব্যবহার হচ্ছিল। তবে এখন অনেক সুনির্দিষ্ট ক্লজ দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের ক্লজ যদি আগেও ব্যবহার হয়ে থাকে সেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। চুপচাপ মেনে নেয়া যাবে না। তার পরও যদি কেউ এ ধরনের ক্লজযুক্ত ঋণপত্র গ্রহণ করে সেটা সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক ও ব্যাংকের বিষয়। আমি মনে করি এ ধরনের ক্লজ থাকলে তা তুলে নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এ ধরনের অ্যাডভার্স ক্লজযুক্ত ঋণপত্র যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যদি সময় কিছুটা বেশিও লাগে, তাতেও আমাদের সচেতন ও সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সাবধান থাকা দরকার, কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবসা করতে গেলে যদি অর্থ পরিশোধ না হয় তার প্রভাব অনেক বেশি নেতিবাচক। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। সব মিলিয়ে অ্যাডভার্স ক্লজগুলো নিয়ে সচেতন ও সতর্ক হতেই হবে।’

ব্যাংকাররাও বলছেন, স্যাংশন সম্পর্কিত ক্লজ এলসিতে আগেও ব্যবহার হতো। তবে যুক্তরাষ্ট্র শ্রম অধিকার ইস্যুতে স্মারক ঘোষণা দেয়ার পর ঋণপত্রগুলোয় বাংলাদেশের জন্য অ্যাডভার্স ক্লজ আরো সুস্পষ্টভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এতে করে সময়ক্ষেপণ ও ব্যবসা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হলেও সবার স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিতে অনেক ব্যাংকের পক্ষ থেকেই তাদের সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে এ ক্ষেত্রে সতর্ক হতে বলা হয়েছে। 

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ধরনের অ্যাডভার্স ক্লজ আগেও ছিল, হয়তো এখনকার মতো সুনির্দিষ্ট ছিল না। এটাও ঠিক যে এ ক্লজগুলো যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে কালক্ষেপণ হয়। আমাদের লিড টাইম অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশিই লাগে, সে প্রেক্ষাপটে সময়ক্ষেপণ কাম্য নয়। তবে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে পদক্ষেপ নিতে অনেক বেশি তৎপর হতে হবে। ঋণপত্র পাওয়ার পরপরই খুঁটিনাটি যাচাই-বাছাই করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। কারণ ব্যাংক, রফতানিকারকের ব্যবসার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশ ব্যবসা না হারায়।’