হাওর-বাঁওড় ঘেরা বিস্তীর্ণ জনপদ কিশোরগঞ্জ। জনগোষ্ঠীর বড় অংশের উপার্জনের প্রধান উৎস কৃষিকাজ ও হাওরে মাছ শিকার। বছরের অর্ধেকটা সময় পানিতে তলিয়ে থাকে আবাদি জমির সিংহভাগই। মাঝারি ও ছোট কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও তা ভৈরব শহরকে ঘিরে। সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ এখন দারিদ্র্য হারের দিক থেকে অতি উচ্চঝুঁকিতে। এ জেলাতেই এখন নগদ অর্থ লেনদেনের আকস্মিক জোয়ার দেখা যাচ্ছে। শুধু গত অর্থবছরেই (২০১৯-২০) কিশোরগঞ্জে ব্যাংকের শাখাগুলোয় নগদ লেনদেন হয়েছে ৭৭ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। যদিও দুই বছর আগেও (২০১৭-১৮ অর্থবছর) এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৪ হাজার ৪২ কোটি টাকার।
পরিসংখ্যান বলছে, কিশোরগঞ্জের ব্যাংকগুলোয় নগদ অর্থের লেনদেন হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তুলনায় ছয় গুণ। প্রতিবেশী জেলা নরসিংদীর তুলনায় এটি চার গুণেরও বেশি। হাওর ও প্রবাসী অধ্যুষিত আরেক জেলা সিলেটের তুলনায়ও এ লেনদেনের পরিমাণ ছয় গুণ বেশি। যদিও শিল্পায়ন, মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচারে তিনটি জেলাই কিশোরগঞ্জের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। এ অবস্থায় কিশোরগঞ্জে নগদ অর্থের এ আকস্মিক জোয়ারের বিষয়টি এখন সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছে।
কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে দিনে ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে তা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) জানানোর নিয়ম রয়েছে। বিএফআইইউ মনে করে, অর্থের উৎস ও গন্তব্য আড়াল করতেই মানুষ নগদ লেনদেন বেছে নেয়। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থও নগদে লেনদেন হয়। পাশাপাশি সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মাদক কারবারিসহ অপরাধ চক্র নগদে অর্থ লেনদেনে পছন্দ করে। এজন্যই নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করতে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছে সংস্থাটি।
কিশোরগঞ্জে আকস্মিকভাবে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে বণিক বার্তা। এ নিয়ে কথা হয়েছে জেলাটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যাংকারসহ নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে। তবে তাদের কেউই জেলাটিতে হঠাৎ করেই নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ জানাতে পারেননি।
তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ একাধিক সূত্র বলছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরকে কেন্দ্র করে মাদক বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। সড়ক, রেল ও নৌপথের মিলনস্থল হিসেবে মাদকের রুট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে ভৈরব। নগদ লেনদেন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটিকে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বৃদ্ধিও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন জেলার কয়েকজন রাজস্ব কর্মকর্তা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তারা জানান, গত কয়েক বছরে কিশোরগঞ্জে কালোটাকা বৈধ করার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বেড়েছে। ফলে আগের চেয়ে এখন অনেক গুণ বেশি অবৈধ অর্থ ব্যাংক খাতে আসছে।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম মনে করছেন, জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়ন এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে নগদ অর্থ লেনদেনের অস্বাভাবিক চিত্র সম্পর্কে আমি অবগত নই। জেলায় এ মুহূর্তে সরকারি বড় কোনো প্রকল্পও চলছে না। হাওর ঘিরে যেসব বড় রাস্তা ও অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলোও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ব্যাংক খাতে নগদ অর্থের লেনদেন যদি অস্বাভাবিক হয়ে থাকে, তা আমরা খতিয়ে দেখব। তবে গত এক দশকে কিশোরগঞ্জ জেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। জেলার আর্থসামাজিক পরিস্থিতিসহ জনগোষ্ঠীর জীবনমানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তৈরি করা দারিদ্র্য মানচিত্র-২০১৬-এর তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের দারিদ্র্য হার ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ। জেলাটির ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১২টিতে উপজেলার দারিদ্র্য হার ‘অতি উচ্চ’। কেবল ভৈরব উপজেলার দারিদ্র্য হারকে ‘উচ্চ’ হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। উপজেলাটিতেও দারিদ্র্য হার ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ। দারিদ্র্য হারের মতোই শিক্ষার হারেও দেশের অনেক জেলার চেয়ে পিছিয়ে কিশোরগঞ্জ। জেলাটিতে শিক্ষার হার এখনো ৫০ শতাংশের নিচে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান মো. জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকীর ভাষ্যমতে, গত এক দশকে কিশোরগঞ্জে বিপুল পরিমাণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির এলাকা হিসেবে কিশোরগঞ্জে বিপুল পরিমাণ সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কিশোরগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণকাজ চলছে। কিশোরগঞ্জের শ্রমশক্তির একটি অংশ প্রবাসমুখী। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘরবাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। সব মিলিয়ে জেলার মানুষের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় নগদ অর্থের লেনদেন বাড়ছে।
কিশোরগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা নরসিংদী। দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে জেলাটির শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ ও সার কারখানাসহ সরকারি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে জেলাটিতে। পাশাপাশি নরসিংদী দেশের রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ জেলাগুলোর একটিও। তার পরও ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলাটির ব্যাংকগুলোতে মাত্র ১৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের প্রতিবেশী বড় জেলাগুলোর অন্যতম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আখাউড়া স্থলবন্দর, আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, গ্যাসক্ষেত্রসহ ছোট-বড় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে জেলাটিতে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যাংকগুলোয় নগদ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। এছাড়া হাওর ও প্রবাসী অধ্যুষিত আরেক জেলা সিলেট এখন দেশের সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর মধ্যে সামনের সারিতে। জেলাটির ব্যাংকের শাখাগুলোয় গত অর্থবছরে মাত্র ১৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
নগদ লেনদেনের তুলনায় কিশোরগঞ্জের ব্যাংকগুলোয় জমা থাকা আমানতের পরিমাণও খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কিশোরগঞ্জে ব্যাংকের শাখাগুলোয় সব মিলিয়ে আমানত জমা ছিল ৬ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। জেলাটির মাথাপিছু আমানতের পরিমাণ ২১ হাজার টাকারও কম। আবার একই সময়ে কিশোরগঞ্জে মাত্র ২ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ বা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকঋণের এ পরিসংখ্যানে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে জেলাটির পিছিয়ে থাকার তথ্যই উঠে আসছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।
কিশোরগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ভৈরব উপজেলা। দেশের পাদুকা শিল্পের ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার কারখানা রয়েছে এখানে। উপজেলাটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাছের বড় বাজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আড়ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভৈরবকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী মাদক বাণিজ্যের সিন্ডিকেটও গড়ে উঠছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে। মাদক বাণিজ্যের এ অর্থ ব্যাংক খাতে নগদ লেনদেন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে সন্দেহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
কিশোরগঞ্জে কেন এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদে লেনদেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। তিনি বলেন, চেকের মাধ্যমে লেনদেন হলে তার উৎস ও গন্তব্য সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু নগদে কেউ ব্যাংকে টাকা জমা দিলে কিংবা উত্তোলন করলে তার উৎস ও গন্তব্য চিহ্নিত করা কঠিন। কিশোরগঞ্জে নগদ লেনদেনের যে পরিমাণ দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। তবে ঘুষ, মাদক কিংবা কালোটাকা ব্যাংকের মাধ্যমে সাধারণত লেনদেন হয় না। তার পরও বিষয়টি বিএফআইইউর পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হবে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মনসুর আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আগে ব্যাংকমুখী ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপুল উন্নয়নসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং কর্মসূচির কারণে মানুষ ব্যাংকে আসছে। তবে সাধারণ মানুষ আরটিজিএস কিংবা ফান্ড ট্রান্সফারে এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। এ কারণে নগদ লেনদেন বেশি দেখাতে পারে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভালো। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।










