বরিশালে ১৫ কোটি টাকার নদী খনন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পলিথিন। ড্রেজার মেশিন চালালেই নদীর তলদেশে বালির নিচে আটকে থাকা পলিথিন পেঁচিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বারবার পলিথিন সরিয়ে খননকাজ করতে হচ্ছে ড্রেজিং বিভাগকে। এ পলিথিনের কারণে চারদিন ধরে বন্ধ বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকার নদী খনন। শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকট রোধে প্রতি বছরের মতো এবারো গত ৪ ডিসেম্বর নদী খনন শুরু করে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগ। তবে সঠিক নিয়ম বা সমীক্ষা ছাড়া এ ড্রেজিংয়ের সুফল বেশি দিন থাকছে না বলে দাবি নৌযান চালক ও মাস্টারদের।

অভিযোগ রয়েছে, যতটুকু গভীরে খনন করার কথা ছিল, তা করছে না ড্রেজিং বিভাগ। তাছাড়া খনন করা বালি ফেলা হচ্ছে মাঝনদীতে।

জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে নাব্য সংকট দেখা দেয়ায় বিভিন্ন নদীর ৪৭টি পয়েন্টে খনন শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার বালি অপসারণে ব্যয় হবে ১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নৌবন্দরে এক লাখ ঘনমিটার বালি অপসারণে খননকাজ চলছে। বন্দরের কাছেই ড্রেজিং চলছে ২০-২৫ দিন ধরে। কিন্তু এখানকার খনন শেষ হচ্ছে না। খনন শুরু করে, ফের বন্ধ। পুরো এলাকায় পলিথিনের একটি স্তর পড়ে গেছে। যার কারণে খনন শুরু করলেই ড্রেজার মেশিনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে পলিথিন।

বরিশাল নৌবন্দর ও বিভিন্ন লঞ্চের মাস্টার চালক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস ধরে চলছে বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকার খনন। ধীরগতিতে চলছে এ খনন। প্রায়ই এটি বন্ধ থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বন্দর এলাকায় ড্রেজিং চলছে দীর্ঘদিন ধরে। কখনো তাদের ড্রেজারের যন্ত্রাংশ ভেঙে কাজ বন্ধ থাকছে। আবার কখনো পলিথিনের অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হয়। লঞ্চঘাট এলাকায় যেখানে-সেখানে তাদের পাইপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পড়ে আছে। ফলে লঞ্চ দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে এ ড্রেজার বিভাগ। তাছাড়া লঞ্চঘাটের বালি কেটে ফেলা হচ্ছে মাঝনদীতে। এই বালি স্রোতের তোড়ে আবার তীরেই ফিরছে বলে দাবি বিভিন্ন লঞ্চ স্টাফের।

বিভিন্ন লঞ্চ মাস্টার জানান, ড্রেজিং বিভাগ অনিয়মিতভাবে খননকাজ করছে। কোনো সময় দেখা যায় খননের সময় বালির পরিবর্তে সাদা পানি বেরিয়ে আসে। ড্রেজিং বিভাগ বালি কেটে তা নদীতে ফেলায় তাদের কাজের স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে টেকসই ড্রেজিং হচ্ছে না। আবার পলিথিনের দোহাই দিয়ে কাজ বন্ধ করে রাখা হচ্ছে।

অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের প্রথম শ্রেণীর মাস্টার মো. আলমাস দেওয়ান জানান, ঢাকা-বরিশাল নৌ-রুটের হিজলা ও বাবুগঞ্জ এলাকায় পানি কম। সেখান থেকে লঞ্চ পরিচালনা করতেই কষ্ট হয়। এছাড়া কালিগঞ্জে পানি কম থাকায় সেখানেও সমস্যা। তিনি বলেন, ‘নদীতে সঠিকভাবে জরিপ না করায় ড্রেজিং করার কারণে আমরা সুফল পাই না। একইভাবে বরিশাল লঞ্চঘাটে বারবার খনন হলেও সুফল আসে না। পাশাপাশি পলিথিনের স্তর রয়েছে এ লঞ্চঘাট এলাকায়।’

বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল ড্রেজিং বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জহির উদ্দিন বলেন, ‘ড্রেজিং কাজ চলমান। পলিথিনের কারণে বরিশাল লঞ্চঘাটে খনন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।’ মাঝনদীতে বালি ফেলার বিষয়ে বলেন, ‘বালি বা পলি কেটে নগরীর ধান গবেষণা এলাকায় ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেটার পাইপ লাইন করতে সমস্যা হওয়ায় নদীতেই ফেলা হচ্ছে। তার মধ্যে এখন খননকাজ বন্ধ। তবে শিগগিরই ফের পুরোদমে এ কাজ করা হবে।’

বরিশাল নদী খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, ‘পরিকল্পিত খননের অভাবে কীর্তনখোলা নদীতে বরিশাল নৌবন্দরটি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বন্দরের উত্তরে বিশাল চর পড়েছে। যে কারণে বন্দর এলাকায় পানি কমে যায়। আর পলিথিন এলাকাজুড়ে রয়েছে। সেটাও খননে বাধার সৃষ্টি করে।’

বিআইডব্লিউটিএ বরিশালের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘খননকাজ বন্ধ। কিন্তু কেন বন্ধ বা কী হয়েছে বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অন্য মাধ্যমে শুনেছি, লঞ্চঘাট এলাকায় ড্রেজিং করতে কষ্ট হচ্ছে। এখানে খনন শুরু করলেই ড্রেজারে পলিথিন পেঁচিয়ে যায়।’

এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ভুইয়া বলেন, ‘পলিথিনের কারণে আমরা খননকাজে এগোতে পারছি না। মূলত আমাদের কাজের ৫০ ভাগ শেষ হয়েছে। আর বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকার বাকি শুধু রসুলপুর বস্তিসংলগ্ন চরের মাথা ও জেল খালের এলাকা। তাহলেই আমরা এখানকার কাজ শেষ করতে পারব।