২০১৮ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত একটি প্রদর্শনীতে অংশ নিতে নিজেদের পাঁচ কর্মীকে পাঠায় চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে দেশে ফেরেননি তাদের কেউই। এরপর ওই বছরই আবার ব্রাজিল ট্রেড ফেয়ারে অংশ নিতে আরো পাঁচ কর্মীর ভিসার আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। ঘন ঘন মেলায় অংশ নিতে ব্রাজিলে যাওয়ার প্রবণতাকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশে অবস্থিত দেশটির দূতাবাস। সেই চিঠির সূত্র ধরেই অনুসন্ধানে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাতেই মেলে করপোরেট কর্মী সাজিয়ে মানবপাচারের প্রমাণ।
সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ টিমের তথ্য বলছে, ব্রাজিলে পৌঁছানো বাংলাদেশীদের মূল টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় পাড়ি দেয়া। এক্ষেত্রে পাচারকারী দলের সহায়তায় ব্রাজিল থেকে কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো—এ চারটি দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের শেষ চেষ্টা করতে হয় বাংলাদেশীদের। অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকায় দক্ষিণ আমেরিকার এসব দেশ মানবপাচার বা মাদক পাচারের বিষয়ে উদাসীন। এ কারণে স্থানীয় দালালদের ম্যানেজ করে সহজেই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় পাচারের শিকার ব্যক্তিদের।
২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্রাজিলে পাঠানো পাঁচ কর্মী ফেরত না আসার পর আগস্টে এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সি নতুন করে আরো পাঁচ কর্মীর ভিসার আবেদন করে। ব্রাজিল দূতাবাস ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর ভিসার আবেদন গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানের মালিক সুশীল কুমার বড়ুয়াকে সাক্ষাত্কারের জন্য তলব করে। সাক্ষাত্কার শেষে তার প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মীকে সশরীরে দেখতে চান দূতাবাস কর্তৃপক্ষ। সে সময় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুশীল কুমার বড়ুয়ার বাদানুবাদ হয়।
স্বল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় ব্রাজিলে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের বিষয়ে দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। তারা ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রদর্শনীতে অংশ নিতে যাওয়া চট্টগ্রামের ওই প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ কর্মীর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। সেখানে তারা জানতে পারে, এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সির পাঁচ কর্মী প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য ব্রাজিল যাওয়ার ভিসা নিলেও তারা কোনো প্রদর্শনীতে অংশই নেননি। উল্টো ব্রাজিলে রিফিউজি স্ট্যাটাসের আবেদন করেছেন এবং অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করেছেন। পরে ব্রাজিল দূতাবাসের পক্ষ থেকে এসব তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয় সিআইডিকে।
ব্রাজিল দূতাবাসের অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করে সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ টিম। তদন্তে তারা জানতে পারে, ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রদর্শনীতে অংশ নিতে যাওয়া পাঁচজন এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সির কর্মী নন। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের ব্রাজিলে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে তিনজনকে শনাক্ত করে দেশে ফেরানো সম্ভব হলেও মবিনুল আলী নবিন ও সেলিম আহমেদ নামের দুজন এখনো দেশে ফেরেননি। ব্রাজিলেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তাছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে ব্রাজিল ট্রেড ফেয়ারে অংশ নিতে যে পাঁচজনকে ব্রাজিল পাঠানোর জন্য ভিসার আবেদন করেছিলেন, তারাও ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন।
তদন্তে এসব তথ্য উঠে আসার পর সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইমের (টিএইচবি) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার একেএম আক্তারুজ্জামান বাদী হয়ে গত ৩ মার্চ মামলা করেন। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনে করা মামলায় আসামি করা হয় এসবি অটো ইকুইপমেন্ট এজেন্সির কর্ণধার সুশীল কুমার বড়ুয়াকে। এসকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে চট্টগ্রামে তার আরো একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে মামলার এজাহারে সিআইডি উল্লেখ করেছে, সুশীল কুমার বড়ুয়া ২০১৮ সালের এপ্রিলে পাঁচজনকে তার কোম্পানিতে নিয়োগপ্রাপ্ত দেখিয়ে সরকারের অনুমোদন ব্যতীত ব্রাজিলের মেলায় অংশগ্রহণের জন্য ভিসা সংগ্রহ করে ব্রাজিলে পাচার করেন। পরবর্তী সময়ে আরো পাঁচজনকে একই উপায়ে মেলায় অংশগ্রহণের নামে ব্রাজিলে পাচারের চেষ্টা করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইমের (টিএইচবি) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার একেএম আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, তদন্ত শেষে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর বেশি এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।










