সিলেটের এমসি কলেজ ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ধর্ষণ-নির্যাতনকাণ্ডের মধ্যেই সামনে এসেছে সাভারের এক কিশোর গ্যাংয়ের ধর্ষণের ঘটনা। এক মাস আগেই সেখানে বেড়াতে যাওয়া দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করে চার কিশোর। এরপর এক মাস পেরিয়ে গেলেও তারা মামলা করতে পারেনি। পরে ধর্ষণের কিছু ডিভিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ চার কিশোরকে গ্রেফতার করে। কেবল এ দুই কিশোরীই নয়, ধর্ষণের শিকার হওয়া এক-চতুর্থাংশ নারীই মামলা করতে পারেন না বলে আইনি সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে।
সংস্থাটি বলছে, ভয়ভীতি ও সামাজিকভাবে সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ধর্ষণের শিকার এক-চতুর্থাংশ নারীই মামলা করতে পারেন না। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬৯২টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৬৩ জনই মামলা করতে পারেননি। এর বাইরে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৯২ জন। তার মধ্যে ৫৮ জন মামলা করতে পারেননি।
এদিকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে জড়িত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা না হলে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন তীব্র হয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলাগুলো নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি সিলেটের এমসি কলেজে নববধূকে গণধর্ষণ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা দুটির দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনাগুলো সংঘবদ্ধ অপরাধ। এসব অপরাধী ক্ষমতাবান হয়। ঘটনার পর তারা নানাভাবে ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ তৈরি করতে থাকে। এসব কারণে অনেকেই ধর্ষণের শিকার হলেও মামলা করতে পারেন না। আবার সামাজিক ব্যবস্থা বিবেচনায় মানসম্মান রক্ষার্থেও অনেকেই মামলা করেন না। তবে চেপে যাওয়ার এমন প্রবণতার ফলে অপরাধীরা আরো বেশি অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান জিয়া রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যেকোনো ধরনের সংকটকালীন পরিস্থিতিতেই অপরাধ বেড়ে যায়। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন বিশেষ পরিকল্পনার। পাশাপাশি আমাদের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ একজন ভুক্তভোগী আজ ধর্ষণের শিকার হয়েও বিচার চাইতে পারেন না। কারণ তার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুযোগ বর্তমান ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে নেই।
এদিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনসহ বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে টানা পঞ্চম দিনের মতো রাজধানীসহ সারা দেশে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থী, বাম ছাত্র সংগঠনের কর্মী ও বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। গতকাল রাজধানীর উত্তরা, শাহবাগে ও বিভাগীয় শহর বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা শহরেও ধর্ষণ-নির্যাতনকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে উত্তরায় সড়ক অবরোধের কারণে ওই এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা এখন বাসা থেকে বের হলেই আমাদের মা-বাবারা চিন্তায় পড়ে যান। আমাদের নিয়ে তারা সারাক্ষণ ভয়ে থাকেন। আমরা এমন সমাজ চাই না। আমরা নিরাপদে বাঁচতে চাই। এ দেশটা কোনো ধর্ষক-নিপীড়কের হাতে বন্দি থাকতে পারে না।
এদিকে একই ঘটনার প্রতিবাদে শাহবাগেও বিক্ষোভ করছে সাধারণ শিক্ষার্থী, বাম ছাত্র সংগঠনের কর্মী ও বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ করছে সেভ আওয়ার উইমেন নামের শিক্ষার্থীদের একটি প্লাটফর্ম। সেভ আওয়ার উইমেন সভাপতি সানজিদা খান বলেন, ‘আমি প্রতিদিন যখন বাসা থেকে বের হই, তেমনি নিরাপদে যেন বাসায় ফিরতে পারি, এটাই আমাদের চাওয়া। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমরা চলতে চাই। আমাকে যেন রাস্তায় ধর্ষণের শিকার হতে না হয়, এটা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।’
এদিকে নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনসহ সারা দেশে অব্যাহত নারী ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় পঞ্চম দিনের মতো রাজধানীর শাহবাগে গণ-অবস্থান ও বিক্ষোভ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও বাম ধারার ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা। তারা বলছেন, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের সহায়তা দেয়া হয়। এতে দোষী ব্যক্তিরা বারবার এমন ঘটনা ঘটায়। ধর্ষক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। পাশাপাশি তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জানান। আজ বেলা ৩টায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ধর্ষণের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর পাশাপাশি শিক্ষকেরাও কর্মসূচি পালন করছেন। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকেরা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুত্ফর রহমান বলেন, যৌক্তিক কোনো আন্দোলনে নিপীড়ন করা উচিত নয়। ভুক্তভোগীর পাশে থেকে ও অপরাধীর বিচার করেই প্রতিবাদকে প্রশমিত করতে হয়।
মানববন্ধনে শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি সমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের এ নেতা বলেন, জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংখ্যায় কম হলেও এ ধর্ষকেরা শক্তিশালী। কারণ তারা পেশি ও অর্থশক্তিতে শক্তিমান। আর এ শক্তিগুলো আসে রাজনৈতিক শক্তি থেকে। তবে ধর্ষক কোনো পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা দলের হতে পারে না। তার পরিচয় সে ধর্ষক। ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশে যে আইন রয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হবে, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। তাহলেই হয়তো ধর্ষণের মাত্রা কমানো যাবে।
শিশু ও নারীদের সুরক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবসময়ই তত্পর রয়েছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয় বাংলাদেশ পুলিশ। অভিযোগ পাওয়ামাত্রই পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। অপরাধীদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। পুলিশ এ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে কখনই সঠিক ব্যবস্থা নিতে কার্পণ্য করে না। আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অনেক মিথ্যা মামলাও চোখে পড়ে, যা পরে তদন্তে প্রমাণিত হয়। কিন্তু পুলিশ যেকোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্রই সেটি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে পুলিশ নানা ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচিও গ্রহণ করে।










