জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে দেশের অনেক নৌপথ। এসব নৌপথ ইজারা দিয়ে বছর বছর বিপুল অর্থ আয় করলেও নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন না সংশ্লিষ্টরা। নৌযান ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও নেই কোনো কার্যক্রম। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুল কর্তৃপক্ষের হাতে নৌঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় নৌ দুর্ঘটনা বাড়ছে।

নৌযান ও নৌ-পরিবহন নিশ্চিত করে তবেই ঘাট ইজারা দেয়ার নিয়ম। নৌ-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে এ নিয়মে। কিন্তু জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নৌঘাটগুলোয় সে চর্চার দেখা মেলে না। ফলে ওইসব ঘাটে নৌযান চলাচল করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই।

গত রোববার পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে একটি নৌকা ডুবে যায়। এতে ৬০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর নৌ নিরাপত্তা গবেষকরা নতুন করে দাবি তুলেছেন, জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নৌঘাটগুলো নৌ খাতের দক্ষ কর্তৃপক্ষের আওতায় পরিচালনা করার।

নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব ও নৌপথ গবেষক আমিনুর রসুল বাবুল বণিক বার্তাকে বলেন, সারা দেশের নৌঘাটের দায়িত্ব কার কাছে থাকবে এ বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের দেশে জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে বেশকিছু নৌঘাট আছে। নৌ নিরাপত্তার জন্য এটি হুমকি বলে মনে করি। জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা নৌ-সংক্রান্ত কোনো বিষয়েই জানেন না। দেশে নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক সংস্থা থাকার পরও জেলা পরিষদের লোকজন কেন নৌঘাট পরিচালনা করবে।

তিনি আরো বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে নৌঘাট থাকার বিষয়টি চর্চা হয়ে আসছে। সে চর্চার এখন পরিবর্তন দরকার। পাশাপাশি জেলা পরিষদ নৌঘাট দিয়ে আয় করে কিন্তু নৌঘাটের সংস্কার কিংবা যাত্রীসেবায় অবকাঠামো নির্মাণ করে না। এটা তো মারাত্মক অন্যায়। যে যাত্রীদের থেকে জেলা পরিষদ আয় করল, সেখানে যাত্রীদের জন্য কোনো অবকাঠামো বানাবে না—এটা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের নৌ খাত পরিচালনা সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে।

একই কথা বলেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সংস্থাটির বন্দর বিভাগের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদেরও স্পষ্ট বক্তব্য, যে যে বিষয়ে দক্ষ তাকে সে বিষয়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের নৌ খাত পরিচালনার কোনো দক্ষতা নেই। তাদের উচিত ঘাটগুলো আমাদের কাছে হস্তান্তর করা। ঘাটগুলো অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রাখার কারণেই বারবার নৌপথে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, করতোয়াসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে চর পড়ে যাওয়ার সমস্যা আছে। কিন্তু জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ড্রেজিং করা হয় না। কারণ ড্রেজিং করার যন্ত্রপাতিও নেই তাদের, আবার অভিজ্ঞতাও নেই। ফলে এভাবেই চলতে থাকে নৌযোগাযোগ সেবা। অবকাঠামো নির্মাণ তো করেই না।

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছোট ছোট নৌঘাট সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর আওতায় দেয়া হলে এতে সমস্যা আরো বাড়বে। প্রথমত, বিআইডব্লিউটিএর জনবল সংকট রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এত ছোট ঘাটের পেছনে বিআইডব্লিউটিএ যদি জনবল দেয় সেটাও সরকারের অপচয় হবে। এর চেয়ে ভালো, জেলা পরিষদের উদ্যোগে পরিচালিত ঘাটগুলো যেন জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেই সংস্কার করা হয় সে বিষয়ে জোর দেয়া উচিত।

জানা গিয়েছে, পঞ্চগড়ের দুর্ঘটনাকবলিত নৌঘাটটিতে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করেনি জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, এটি ভাঙনপ্রবণ এলাকা। অবকাঠামো নির্মাণ করলে সেটি থাকে না। তাই কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, নৌঘাটগুলো জেলা প্রশাসকদের একটি বড় আয়ের উৎস। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে নৌযান পরিদর্শন করার সক্ষমতা নেই। এ বিষয়ে আমাদের কোনো লোকও নেই। বিআইডব্লিউটিএর মতো আমাদের যদি নৌ পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করি।