নড়াইলে প্রতি বছরই মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করছেন চাষীরা। মাত্র তিন বছরে এ জেলায় মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৫০ গুণ। তিন বছর আগে (২০১৮ সালে) নড়াইলে সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ২ টন। এরপর থেকে প্রতি বছরই সরিষা ক্ষেত থেকে মধু উৎপাদন বাড়ছে। ফলে চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ টন।
এদিকে সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করায় সরিষার ফলনও বেড়ে গেছে। মধুর উৎপাদন বাড়লেও স্থানীয় চাষীরা মধুর ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। খামারিদের অভিযোগ, ক্ষেত থেকে পাইকাররা মধু কিনে নিয়ে গেলেও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। সরকারিভাবে মধু সংগ্রহ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।
বিসিক সূত্রে জানা গেছে, অল্প খরচে চাষ করতে পারায় দিন দিন মধু চাষের দিকে ঝুঁকছেন এলাকার কৃষক। দেশে মৌচাষে বর্তমানে নড়াইলের অবস্থান দ্বিতীয়। অল্প বিনিয়োগে ভালো লাভ, বর্ষাকালীন খামার পরিচর্যার জন্য উপযুক্ত পরিবেশসহ অনুকূল অবস্থার কারণে নড়াইলে মৌচাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে মৌ-খামারির সংখ্যা শতাধিক। এ সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে।
পুরাতন বাজার এলাকার মধুচাষী মো. কল্যাণ জানান, মধু আহরণের মৌসুম নভেম্বর-মে পর্যন্ত। এ ছয় মাসে ভ্রাম্যমাণ মৌ-খামার নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটতে হয় চাষীকে। যেখানেই ফসলের মাঠজুড়ে সরিষা, মসুর, খেসারি, তিল, তিসি, ধনেফুলসহ নানা ফুলের হাতছানি সেখানেই মধু আহরণে আস্তানা গাড়েন মৌ-চাষীরা। নভেম্বরে সরিষা, মসুর, খেসারি, ধনেফুলসহ বিভিন্ন রবি ফসলে ফুল এলে নড়াইল এবং পাশের মাগুরা ও ফরিদপুর জেলায় মধু সংগ্রহ শুরু করেন তারা। লিচু ফুল থেকে মধু আহরণ করতে গাজীপুর, পাবনা, যশোরেও চলে যান তারা। এভাবে সর্বশেষ মে মাসে সুন্দরবনে গেওয়া, গরান, খলিষা, বাইন, কেওড়া ফুলের মধু আহরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় মধু সংগ্রহের মৌসুম।
খামারি মোহাম্মাদ শম্পি জানান,
প্রত্যেক চাষী মৌসুমে সরিষা ক্ষেত থেকে গড়ে প্রায় ২ টন মধু সংগ্রহ করেন। বর্তমানে চলছে সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহের মৌসুম। জমি থেকে পাইকাররা ১৫০-২০০ টাকা কেজি দরে মধু কিনে নিয়ে যান। সেই মধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করেন।
খামারি রিপন মোল্লা জানান, সারা দেশে নড়াইলের মধুর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও নড়াইলের স্থানীয় চাষীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আরেক চাষী আল-মুহিত জানান, এক কেজি মধু উৎপাদন করতে ১২০-১৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। যখন ক্ষেতে ফুল থাকে না তখন মৌমাছিকে খাবার খাওয়াতে হয়। সারা বছর মৌমাছির পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়।
মৌচাষী আনিচুর মিজান জানান, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় ভরা মৌসুমে প্রতিটি বড় মৌবাক্স থেকে (৯ ফ্রেমবিশিষ্ট) ছয়/সাতদিন অন্তর ৩৫-৪০ কেজি মধু পাওয়া যায়। ছোট বাক্স থেকে ১৮-২০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। উৎপাদিত মধু মৌচাষীরা ঢাকার বনফুল, এপি, স্কয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানি এবং স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে থাকেন। প্রতি টন মধুর বর্তমান বাজারমূল্য দেড় লাখ টাকা।
মৌচাষী নাসিম শেখ জানান, মৌমাছির রোগবালাই বলতে মাইট রোগ, মাথাঘোরা রোগ হয়। পরিবহনসহ প্রতি ফ্রেম মৌমাছি প্রতিপালনে বছরে গড়ে সাড়ে ৩০০ টাকা খরচ হয়। মৌচাষের প্রধান সমস্যা মধু বিক্রি। উদ্যোগের অভাবে দেশ-বিদেশে মধুর বাজার সম্প্রসারিত না হওয়ায় উৎপাদিত মধু বিক্রি করতে তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। উপরন্তু ভারতীয় ডাবর কোম্পানিসহ বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির মধু আমাদের দেশে আমদানি করা হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে কষ্টার্জিত মধু বিক্রি করতে হয় পানির দরে। তার দাবি সরকারিভাবে চাষীদের কাছ থেকে মধু সংগ্রহ করা হোক।
মৌচাষী তালেব মুন্সি বলেন, বর্তমানে নড়াইলে মৌচাষ ব্যাপক হয়ে উঠেছে। পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মৌশিল্পকে অপার সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করা সম্ভব। যেখানে দেশের হাজার হাজার বেকারের কর্মসংস্থান হতে পারে।
বিসিক নড়াইল জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. মামুনুর রশীদ বলেন,
চলতি বছর মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ টন। আশা করছি চলতি মৌসুমে সরিষা ক্ষেত থেকে লক্ষ্যমাত্রার বেশি মধু উৎপাদন হবে।
তিনি আরো বলেন, ১৫ বছর ধরে নড়াইলে নিজস্ব চেষ্টায় অনেক কৃষক মৌচাষে এগিয়ে আসেন। ফলে মৌচাষের একটা ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বিসিক এ মৌচাষীদের একীভূত করে আধুনিক প্রযুক্তিতে মৌচাষ প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। জেলায় মৌচাষীদের উন্নয়নে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হয়েছে। মৌবাক্সসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে নতুন নতুন মৌচাষী তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মধু বাজারজাতকরণে বিসিকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচোনা করেছেন। তিনি আশা করেন, অল্প দিনের মধ্যে মৌচাষীরা তাদের উৎপাদিত মধুর ন্যায্যমূল্য পাবেন।










