এ ঘটনায় রাত ১টা পর্যন্ত ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান রাত ১২টা ৫০ মিনিটে বাস থেকে ১৪ জনের লাশ উদ্ধারের কথা নিশ্চিত করেন। আর এর আগে আরো দুজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। ফায়ার সার্ভিসও ১৬ মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে পুরুষ ৪ জন, নারী ১০ জন ও শিশু ২ জন।

ডুবে যাওয়ার ৬ ঘণ্টা পর বাসটি টেনে তোলে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসের একটি অংশ দৃশ্যমান হয়। সাড়ে ১১টা নাগাদ পুরো বাসটি জাহাজ হামজার ক্রেন দিয়ে টেনে পানির ওপরে তোলা হয়।

ফায়ার সার্ভিস, প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে কমপক্ষে ৫০ জন যাত্রী ছিল। নদীতে পড়ার পর ১১ জন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। আর বাসটি মুহূর্তেই তলিয়ে যায়।

এরপর উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থলে আসে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। ডুবুরি দলও উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। পরে যোগ দেয় সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশ। পানির ৯০ ফুট নিচে শনাক্ত হয় বাসটি। দুর্ঘটনার পর পরই ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। বিঘ্ন ঘটে ফেরি চলাচলেও। এতে আরিচা ও দৌলতদিয়া দুই ঘাটেই যানবাহনের ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়।

এদিকে এ ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা তিন কার্যদিবসের মধ্যে আমাদের রিপোর্ট দেবেন। আর নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। তারাও তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবেন। এরপর আমরা জানতে পারব কী ঘটেছিল।’

নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সারা রাত উদ্ধারকাজ চলবে। ভোরের আলো ফুটলে কাজ আরো বেগবান হবে।

রাত ১০টার দিকে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, ‘দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি পানির ৮০-৯০ ফুট নিচে শনাক্ত করা হয়েছে। আমাদের ডুবুরি দল উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে বেগ পেতে হচ্ছে। বাসের সব জানালা বন্ধ থাকায় কতজন আটকে আছেন তা বোঝা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৪০ জনের মতো যাত্রী আটকা পড়েছেন।’

ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের কমান্ডার মো. বেলাল উদ্দিন জানান, ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের দুজন ডুবুরি, দুজন সহকারী ডুবুরি উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পাশাপাশি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ফায়ার সার্ভিসের একটি দল উদ্ধারকাজে অংশ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উদ্ধারকারী জাহাজ অনেক দেরিতে এসে পৌঁছায়। তাছাড়া ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলও ১ ঘণ্টার বেশি সময় পর উদ্ধারকাজ শুরু করে।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘বিকাল ৫টার কিছু পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য তাতে উঠতে না পারায় অন্য ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে “‍হাসনা হেনা” নামক একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়ে।’

রাজবাড়ী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, ‘মরদেহগুলো উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে।’

কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনালে অবস্থিত সৌহার্দ্য পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার তন্বয় শেখ জানান, দুপুরে বাসটি ছয়জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এরপর খোকসা, মাছপাড়া, পাংশা থেকে যাত্রী ওঠানো হয়। গোয়ালন্দ ঘাট থেকেও কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ বাসে অন্তত ৫০ জন ছিলেন।

ওই বাসের এক যাত্রী আব্দুল আলিম বলেন, ‘পদ্মার মোড় থেকে আমি বাসে উঠি। বাসটিতে প্রায় ৫২ জন যাত্রী ছিল। কোনো আসন খালি না থাকায় আমি ইঞ্জিনের ওপর বসি। ফেরির জন্য অপেক্ষা করার সময় আমি বাস থেকে নামি, তাই প্রাণে বেঁচে গেছি।’

শরীফ নামে এক যুবককে দেখা যায় ঘাট এলাকায় আহাজারি করতে। তার ছেলে সাবিত আর ভাগনি সোহানা আক্তার ছিল তলিয়ে যাওয়া বাসটিতে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শরিফ বলেন, ‘রাজবাড়ী থেকে আমার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, বোন ও বোনের ছেলে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে ওঠে। ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী, মেয়ে ও বোন স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাড়ে উঠতে পারলেও আমার সাত বছরের ছেলে ও ১১ বছর বয়সী ভাগনি নিখোঁজ। ওরা তো আর নেই, এখন ওদের লাশটা আমাকে বুঝিয়ে দেন। আমার টাকার দরকার নেই, আর কিচ্ছু লাগবে না, আমার সব শেষ।’

দৌলতদিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা বলেন, ‘এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করার মতো পরিস্থিতিতে নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কিছু বলতে পারব।’

ঘটনাস্থলে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তাকে অবগত করতে বলেছেন।’

এদিকে এ ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রাতে এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। প্রাণহানিসহ ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের পরিবার-পরিজনদের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সহমর্মিতা।’

এছাড়া গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল রাতে ফেসবুকে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি এই শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই, উদ্ধার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’