নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। বন্ধ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানা। তবে ব্যতিক্রম সিলেটের ৬০০ ইটভাটা। এখনো এসব ইটভাটায় চলছে ইট পোড়ানোর কাজ। করোনার তীব্র ঝুঁকি নিয়েই এসব ভাটায় কাজ করছেন প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক।

মালিকদের দাবি, বর্তমানে ভাটায় ইট পোড়ানোর মৌসুম চলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। এ অবস্থায় এখন যদি কাঁচা ইট পোড়ানো সম্ভব না হয়, তাহলে লোকসান গুনতে হবে তাদের।

এদিকে শ্রমিকরা বলছেন, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছুটি না পাওয়ায় বাড়ি যেতে পারছেন না তারা। চাকরি বাঁচানোর আশায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেট বিভাগে প্রায় ৬০০ ইটভাটা রয়েছে। সবকয়টিতে এখন ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চালু রয়েছে। কাজে নিয়োজিত আছেন শ্রমিকরা। অস্থায়ী শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হলেও এখনো প্রায় ১৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক এসব ভাটায় কাজ করছেন। বেশির ভাগ ভাটায়ই মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। এতে করোনা ঝুঁকি আরো বাড়ছে।

ইটভাটা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ভাটায় ইট পোড়ানোর মৌসুম শুরু হয়। আবার বৃষ্টি শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় পোড়ানো। ফলে এ কয়েক মাসই ইটভাটার উৎপাদন মৌসুম। সিলেটে এ বছর এখনো বৃষ্টি শুরু না হওয়ায় চলছে ইট পোড়ানোর কাজ। অন্য সব প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে শ্রমিকদের ছুটি দিলেও ভাটার শ্রমিকদের এখনো কাজ করতে হচ্ছে।

সিলেট ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি দেলওয়ার হোসেন বলেন, এখন ইটভাটা বন্ধ করে দিলে আমাদের অনেক লোকসান গুনতে হবে। এমনিতেই কয়লা সংকটের কারণে এবার ইট পোড়ানো শুরু করতে দেরি হয়েছে। এখনো প্রতিটি ভাটায় অনেক কাঁচা ইট রয়েছে। 

তিনি বলেন, আমরা বেশির ভাগ শ্রমিককেই ছুটি দিয়েছি। বর্তমানে দু-তিনজন করে শ্রমিক কাজ করছেন। তারা ইটভাটার চুল্লির আগুন তদারক করছেন। 

গত বৃহস্পতিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জের হিলালপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি দুটি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজ চলছে। কাজে নিয়োজিত আছেন শ্রমিকরা। ঘা ঘেঁষাঘেঁষি করেই কাজ করছেন তারা। নেই পর্যাপ্ত পানি ও সাবানের ব্যবস্থা।

এখানকার একটি ইটভাটায় কাজ করেন শ্রমিক আসাদুর রহমান। তিনি বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বাড়িতে থাকার কথা বলা হচ্ছে শুনেছি। কিন্তু ছুটি না দিলে তো বাড়িতে যেতে পারছি না। চাকরি চলে গেলেও বিপাকে পড়ব। 

তিনি বলেন, দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে চেষ্টা করি। তবে একসঙ্গে কাজ করতে গেলে তো ছোঁয়াছুঁয়ি হয়েই যায়। খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানোও একসঙ্গে করতে হয় আমাদের। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের এক ইটভাটা মালিক বলেন, আমার ভাটায় এখনো ১০ লাখ কাঁচা ইট রয়েছে। আর কয়দিন পরই বৃষ্টি শুরু হবে। এর আগেই এগুলো পোড়াতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে বিরাট অংকের লোকসান গুনতে হবে। এ কারণে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা জেনেও ইটভাটা বন্ধ করতে পারছি না। নিজেও নিয়মিত ভাটায় যাই। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণকাজ চলমান থাকায় এখন ইট বিক্রিও হচ্ছে।

তবে ইটভাটাগুলোয় স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজ করানো হচ্ছে বলে জানান সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব। তিনি বলেন, ইটভাটার চুল্লিতে একবার আগুন দিলে তা বন্ধ করা খুব কষ্ট। তাই ভাটা মালিকরা আগুন বন্ধ করতে পারছেন না। তবে তারা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রেখেই উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। 

এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এম এমাদুল ইসলাম বলেন, ইটভাটার শ্রমিকদের ছুটি দেয়া হয়েছে বলে মালিকরা আমাকে জানিয়েছেন। কেবল দুয়েকজন করে লোক ভাটায় রয়েছেন। যারা ইট পোড়ানোর বিষয়টি তদারক করছেন, এমনটিও জানিয়েছেন তারা। 

জেলা প্রশাসক বলেন, ইটভাটাগুলোয় যদি এখনো শ্রমিকরা কাজে নিয়োজিত থাকেন, তবে সেটা অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। আমি এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।