সার্ভারে সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন না আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে শুল্কায়নের কার্যক্রম অনলাইনে হওয়ায় গত প্রায় এক সপ্তাহ পণ্য খালাস কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে। এতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে বন্দর থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমে। এমন সময়ে জট কমাতে স্টোর ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়েছে।
বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) দপ্তরের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাভাবিক অপারেশনাল কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে আমদানি-রফতানিকারকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়ার লক্ষ্যে অবিলম্বে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি হওয়া এফসিএল কনটেইনারগুলো বন্দর অভ্যন্তর থেকে খালাস নেয়ার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। তা না হলে রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার) ২০০১-এর ১৬০ ধারার আলোকে কমন ল্যান্ডিং তারিখের পর ২১তম দিন থেকে প্রযোজ্য স্ল্যাবের স্বাভাবিক ভাড়ার ওপর চার গুণ হারে স্টোর রেন্ট আরোপে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ১৫ মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের পর প্রথম চারদিন বিনা খরচে বন্দরে কনটেইনার রাখার সুবিধা পান ব্যবসায়ীরা। এর পর থেকে ২০ দিন পর্যন্ত কনটেইনার আকারভেদে ২৪ কিংবা ৪৮ ডলারে রাখার সুযোগ থাকে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যখন মাসের পর মাস নামমাত্র মূল্য পরিশোধ করে বন্দরে কনটেইনার ফেলে রাখে, তখন বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। মূলত আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে এ সমস্যা সমাধানের জন্যই ২১তম দিন থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে চার গুণ ভাড়া আদায়ের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি বন্দরের কার্যক্রম স্বভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে নির্দেশনাটিতে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে বন্দরের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা খালি রাখতে হয়। আশা করি ব্যবসায়ীরা নির্দেশনা অনুযায়ী বন্দর থেকে দ্রুত কনটেইনার ডেলিভারির উদ্যোগ নেবেন।’
এদিকে এ সিদ্ধান্তের প্রত্যাহার চেয়ে গতকালই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন রফতানিকারকরা। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পক্ষ থেকে বন্দরকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এফসিএল কনটেইনারগুলো কমন ল্যান্ডিং পরবর্তী সময়ে ২১ দিন হতে প্রযোজ্য ভাড়ার ওপর চার গুণ হারে স্টোর রেন্ট আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাস্টমস সার্ভার সমস্যার কারণে শুল্কায়ন করা সম্ভব না হওয়ায় বন্দর থেকে পণ্য চালান ডেলিভারি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চার গুণ হারে বর্ধিত স্টোর রেন্ট আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় শতভাগ রফতানিমুখী পোশাক শিল্পসহ আমদানিকারকেরাও বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
ওয়েল গ্রুপের পরিচালক ও বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম আপগ্রেড-পরবর্তী কাস্টমস সার্ভারে সমস্যাজনিত কারণে পণ্য চালান এখন পর্যন্ত শুল্কায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া প্রায়ই বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্য চালান ডেলিভারি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে এফসিএল কনটেইনারের কমন ল্যান্ডিং-পরবর্তী ২১ দিন থেকে প্রযোজ্য ভাড়ার ওপর চার গুণ হারে বর্ধিত স্টোর রেন্ট আরোপের সিদ্ধান্ত স্থগিত করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্বের জন্য আমদানি ও রফতানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। রফতানিকারকদের ক্ষেত্রে রফতানি পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে ডেলিভারি না হলে রফতানি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজীকরণের ব্যাপারে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। শুল্ক পরিশোধ করাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ না করলে বন্দর থেকে মালপত্রও যথাসময়ে খালাস নেয়া সম্ভব নয়। পণ্য নিয়ে জাহাজ বন্দরের জলসীমায় আসার পর অনলাইনে বিল অব এন্ট্রি (আগাম চালানপত্র) দাখিল করতে হয় কাস্টম হাউজের অটোমেশন সিস্টেমে।
বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দর দিয়ে দ্রুত পণ্য খালাস করতে হলে শুল্কায়ন প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা অপরিহার্য। নতুবা খেসারত দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। বন্দর কর্তৃপক্ষ যে অভিযোগ করেছে, অর্থাৎ অনেক আমদানিকারক এফসিএল কনটেইনারভর্তি পণ্য এনে বন্দরের অভ্যন্তর থেকে খালাস না নিয়ে দিনের পর দিন বন্দরে স্টোর করে রাখে। সেক্ষেত্রে এটা আমদানিকারকের দায়। কিন্তু সরকারেই কোনো সংস্থার প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে যে সময়ক্ষেপণ সেটা কেন ব্যবসায়ীরা বহন করবেন।’
এনবিআরের তথ্যমতে, কাস্টমসের সার্ভার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। চট্টগ্রাম কাস্টমসে প্রতিদিন বিল অব এন্ট্রি দাখিল হয় সাড়ে সাত হাজার। এর মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি হচ্ছে রফতানি-সংশ্লিষ্ট। আর আমদানির বিল অব এন্ট্রি হচ্ছে দুই হাজারের মতো। বছরের বিভিন্ন সময়ে সার্ভারের এ সমস্যায় চট্টগ্রাম কাস্টমসে শুল্কায়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে পণ্য শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। সার্ভারে সমস্যার কারণে অনলাইনে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে দেরি হওয়ায় শুল্ককর পরিশোধের পর ছাড়পত্র পেতেও সময় বেশি লাগছে। এর প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন রাজস্ব আদায় কার্যক্রমেও। গত অর্থবছরে রেকর্ড ৫১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। চলতি অর্থবছরে এ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬৫ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষে চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব আয় করেছে ২৭ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার মো. সালাহউদ্দিন রিজভী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাইগ্রেশনের কারণে সার্ভারে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। এতে শুল্কায়ন কার্যক্রমে সময়ক্ষেপণ হলেও এখন পণ্য শুল্কায়নে উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে এ মাইগ্রেশন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে গেলে অনেক ভালো গতি নিশ্চিত হবে। এতে আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হবেন।’
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে অটোমেশনের যাত্রা হয় ১৯৯৫ সালে। এরপর অ্যাসাইকুডা প্লাস প্লাস ভার্সন থাকলেও ২০১৩ সালে কাস্টমসে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু বছরে প্রায় সময়েই সার্ভারের গতি কমে যাওয়া কিংবা বিকল হয়ে যাওয়ার ফলে দুর্ভোগে পড়ার অভিযোগ করা হয় আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার্ভার সমস্যার কারণে শুল্কায়ন কার্যক্রমে ধীরগতি একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থেকে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। বিল অব এন্ট্রি বা বিল অব এক্সপোর্ট সময়মতো দাখিল না হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কারণ তখন বন্দর থেকে পণ্য খালাস করা যায় না নির্দিষ্ট সময়ে। প্রায় সময়েই প্রযুক্তির এ সমস্যা স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে এনবিআর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’










