ডিজিটাল বাংলাদেশের পর এবার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সে জন্য পথনকশা পরিকল্পনা করেছে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। পথনকশায় স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইসিটি বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগ পরিকল্পনা এখনো গ্রহণ করা হয়নি।
৫ হাজার ২৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্মার্ট সিটি গড়ার পরিকল্পনা করার বিষয়টি জানিয়েছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। তাদের দেয়া তথ্যমতে, উদ্যোগটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে কেরানীগঞ্জে। তবে সেখানে পরিমাণমতো জায়গা না পেলে দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকায় এটি স্থানান্তরিত হতে পারে। স্মার্ট সিটির বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া আরো তিন দফায় যথাক্রমে ৫ হাজার কোটি, ৬০ কোটি ও ১০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ পরিকল্পনার শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে ২০৪১ সালে।
জানা গিয়েছে, প্রস্তাবিত স্মার্ট সিটি কাঠামোয় স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, জননিরাপত্তা, ইউটিলিটি ও নগর প্রশাসনসহ মোট পাঁচটি উপাদান এবং পরিষেবাকে মোটাদাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিনিয়োগসংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। সেখানে কোন কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবে এ-সংক্রান্ত বিষয়ও সুনির্দিষ্ট নয়।
২০১৫ সালে ১০০টি শহরকে স্মার্ট সিটি বিনির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে পাশের দেশ ভারত। পরের বছর স্মার্ট সিটি হিসেবে ২০টি শহরের নাম প্রকাশ করে দেশটির সরকার। প্রকাশিত ওই তালিকায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রদেশ আসামের গুয়াহাটিও স্থান পায়। যদিও কয়েক ধাপে বাস্তবায়নাধীন ভারতের স্মার্ট সিটি মিশনটি এখনো সম্পূর্ণভাবে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়নি। এবার বাংলাদেশেও স্মার্ট সিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে সমন্বিত পথনকশা তৈরি করতে গত ১৭ জুলাই শ্রীমঙ্গলে কর্মশালা পরিচালনা করে আইসিটি বিভাগ। ২২ জুলাই পর্যন্ত চলা ওই কর্মশালায় নয়টি দপ্তর ও সংস্থার ৭৩ জন কর্মী অংশ নেন। কর্মশালায় স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে স্মার্ট আইসিটি বিভাগ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সেখানে প্রতিটি দপ্তর ও বিভাগ আলাদা পথনকশা প্রণয়ন করে। আইসিটি বিভাগের আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোর প্রণয়ন করা পথনকশায় মোট ৯৭টি উদ্যোগ স্থান পায়। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ স্মার্ট সিটির উদ্যোগসহ মোট ২০টি উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়।
আইসিটি বিভাগের পথনকশায় স্মার্ট সিটির বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরা হয়েছে। এনার্জি এফিশিয়েন্ট, ক্যাশলেস ও পেপারলেস পরিষেবা এবং সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগর নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখেই পরিকল্পিত এ সিটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ উদ্যোগ চার ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পথনকশায় আরো তুলে ধরা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ২০২৩ সালের মধ্যে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্ট হাসপাতাল, স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয়, স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হবে। যার মাধ্যমে স্মার্ট সমাজ বিনির্মাণের পাশাপাশি স্মার্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রম সেখানে পরিচালিত হবে। এ সময়ের মধ্যে এ সিটিতে ৫০টি কোম্পানি গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পথনকশায় তুলে ধরা হয়েছে, আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট সিটি প্রকল্পের সুফল নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ কার্যকরী হবে। প্রকল্প এলাকায় স্মার্ট হেলথ সিটির পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প এলাকায় ২০০ কোম্পানি গড়ে তোলা হবে, যার ফলে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) সফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের স্মার্ট সিটি গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কেরানীগঞ্জে হাই-টেক পার্ক হচ্ছে। সেটিও স্মার্ট সিটির আদলে হবে। এছাড়া দোহার-নবাবগঞ্জে স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পরিবেশের ক্ষতি না করে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য উন্নততর জনবান্ধব সেবা প্রদানে আধুনিক প্রযুক্তিগুলোকে কাজে লাগানো।
কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী স্মার্ট সিটির তালিকা প্রকাশ করে আসছে সুইস বিজনেস স্কুল অব ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট (আইএমডি)। শহরের নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত তথ্যকে সূচক হিসেবে ব্যবহার করে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালে ১১৮টি স্মার্ট সিটির তালিকা প্রকাশ করে সংস্থাটি। সেই তালিকায় ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু—এ চারটি শহরের নাম স্থান পায়। উপমহাদেশের আর কোনো শহরের নাম স্থান পায়নি আইএমডির করা ওই তালিকায়।
নগরবাসীর মাঝে স্মার্টনেস জাগ্রত না হলে স্মার্ট সিটি বিনির্মাণের লক্ষ্য পুরোপুরি পূরণ হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, স্মার্ট সিটি নির্মাণের আগে আমাদের নিজেদের স্মার্টনেসটা গ্রো করতে হবে। একটি স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা হলো, কিন্তু সেখানে যদি উল্টা পথে গাড়ি চালানো হয় অথবা নির্ধারিত স্থান বাদে অন্য জায়গা দিয়ে রাস্তা পারাপার করা হয় তাহলে স্মার্ট সিটি নির্মাণের লক্ষ্য পূরণ হবে না। সে জন্য মানুষকে আগে স্মার্ট সিটির পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্মার্ট সিটি সফলতা পেয়েছে আবার কোথাও কোথাও পায়নি। যারা সফল হয়েছে তাদের পরিবেশের সঙ্গে আমাদের পরিবেশটা মেলাতে হবে। অথবা ওদের যে পরিবেশ সেই পর্যায়ে আমাদের পরিবেশকে নিয়ে যেতে হবে, তাহলে সামগ্রিকভাবে স্মার্ট সিটির সুফল মিলবে।
দেশে মেট্রোরেলের কার্যক্রম শুরুর পর সেটির সঙ্গে দেশের মানুষ খাপ খাওয়াতে পারলে স্মার্ট সিটির লক্ষ্য একধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক। তিনি বলেন, স্মার্ট সিটির প্রথম ধাপ হিসেবে মেট্রোরেলকে বিবেচনা করা যেতে পারে। মেট্রোরেল প্রকল্প যদি সফলতা পায়, তাহলে আমাদের জনগণ স্মার্ট সিটির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কারণ মেট্রোরেল প্রজেক্টটা স্মার্ট সিটির উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
দেশে স্মার্ট সিটির বিনির্মাণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা স্মার্ট সিটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছি। এটা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এখনো বলার মতো কিছু হয়নি। এটির বাস্তবায়ন সরকারি অর্থে হবে নাকি বিদেশী বিনিয়োগে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তিনি বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের স্মার্ট সিটির অভিজ্ঞতাটা ভালো না। সেটিও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। সেখানে স্মার্ট সিটির কার্যকারিতার সফলতা পাচ্ছেন না। তবে ভিয়েতনামে সফল হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
স্মার্ট সিটিতে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বিকর্ণ কুমার ঘোষ বলেন, স্মার্ট সিটির ব্যাপ্তিটা বিশাল। এখানে অনেক বড় বিনিয়োগের বিষয় রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আরো বিনিয়োগকারী খুঁজছি।
একই প্রসঙ্গে আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। আর স্মার্ট সিটির জন্য আলাদা পরিকল্পনা হচ্ছে।










