মতিঝিলের আদমজী কোর্ট ভবনে ছিল প্রাইম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। ব্যাংকটির জন্ম থেকে বিকাশ—সবকিছুর সাক্ষী বহু বছরের পুরনো ভবনটি। এ ভবনে বসেই ব্যাংক পরিচালনা করেছেন অতীতের সব শীর্ষ নির্বাহী। ২০১৭ সালের শেষের দিকে অনেকটা আকস্মিকভাবে প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগ পান রাহেল আহমেদ। যোগদানের পর আর মতিঝিলের সেই পুরনো কার্যালয়মুখী হননি তিনি। দাপ্তরিক কাজ সারতেন গুলশানের অভিজাত ভবন ‘সিম্পল ট্রি আনারকলি’তে বসেই। বসবাস করতেন গুলশানের অভিজাত হোটেলে। হোটেল থেকেই আসতেন ব্যাংকে, আবার ফিরে যেতেন হোটেলে। এভাবেই নিজেকে অভিজাত ও অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রমী হিসেবে উপস্থাপন করতেন তিনি।
ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় বিদেশী ব্যাংকে চাকরি করা রাহেল আহমেদ নিজেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকার’ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাইম ব্যাংককেও সেভাবে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এজন্য ছাঁটাই করেছিলেন পুরনো কর্মীদের। পুনর্গঠনের পেছনে খরচ করেছিলেন ব্যাংকের বহু অর্থ। যদিও তিন বছরে প্রাইম ব্যাংককে সামনে টানা তো দূরের কথা, অতীতের গৌরবও ফেরাতে পারেননি এ শীর্ষ নির্বাহী। উল্টো কয়েক বছর ধরে অনেকটাই স্থবির ছিল প্রাইম ব্যাংক। এ সময়ে ব্যাংকটির বেশির ভাগ সূচকেই অবনমন হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয়দিন আগেই পদত্যাগ করতে হয়েছে রাহেল আহমেদকে। দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাচ্ছেন না, এটি নিশ্চিত হয়েই গত মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন তিনি।
যদিও রাহেল আহমেদ বলছেন, অপেক্ষাকৃত ভালো জায়গায় যাওয়ার জন্যই তিনি প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গত ছয় বছর আমি প্রাইম ব্যাংক পরিবারের অংশ ছিলাম। ডিএমডি ও এমডি হিসেবে আমি যে পরিবর্তন চেয়েছিলাম, প্রাইম ব্যাংকে তা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমি সফল ও সন্তুষ্ট। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রাইম ব্যাংকের মানবসম্পদসহ বিভিন্ন বিভাগ ঢেলে সাজানো হয়েছে। এজন্য অনেকে চাকরি ছেড়ে গেছেন। আমরা যোগ্যদের নিয়োগ দিয়েছি। প্রাইম ব্যাংক বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, এখান থেকে বড় ধরনের সফলতার পথে যেতে পারবে।
একসময় বড় ব্যবসায়ীদের ভরসাস্থল ছিল প্রাইম ব্যাংক। করপোরেট বিনিয়োগে ব্যাংকটির ছিল শক্তিশালী ভিত। রিটেইলে নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জন্যও প্রশংসিত ছিল ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে সমসাময়িক অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশ এগিয়ে ছিল প্রাইম ব্যাংক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ব্যাংকটি এখন বিবর্ণ।
২০১৫ সালে প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নিয়োগ পান রাহেল আহমেদ। এর আগে সাত বছর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুটি ব্যাংকে চাকরি করেন। তারও আগে দেশে চাকরি করেছেন বহুজাতিক ব্যাংক এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। সব মিলিয়ে রাহেল আহমেদের ক্যারিয়ারের বড় সময়জুড়ে ছিল বিদেশী ব্যাংক। ডিএমডি হিসেবে প্রাইম ব্যাংকে যোগদানের পর ব্যাংকটির বিজনেস মডেল পুনর্গঠন ও সেন্ট্রালাইজেশনের দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সালের মধ্যেই এ পুনর্গঠন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা শেষ করতে পারেনি ব্যাংকটি, যার খেসারত গুনেছে প্রাইম ব্যাংক।
পাঁচ বছর ধরে অস্বাভাবিক স্থবিরতা বিরাজ করছে প্রাইম ব্যাংকে। থমকে গেছে ব্যাংকটির আমানত ও সম্পদের প্রবৃদ্ধি। হতাশাজনক পরিস্থিতি ব্যাংকের মুনাফায়ও। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধান তৈরি হওয়ায় প্রাইম ব্যাংকের বড় গ্রাহকরা ব্যাংকটি ছেড়ে যেতে শুরু করেন। ব্যাংকটির খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণও বাড়ছে ক্রমাগত। সব মিলিয়ে জৌলুশ হারানো প্রাইম ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে অবস্থানও হারিয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। অথচ এ সময়ে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, প্রাইম ব্যাংকের ঋণে প্রবৃদ্ধি না হয়ে উল্টো কমেছে। যদিও এ সময়ে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে হয়েছে ব্যাংকটিকে।
ঋণের প্রবৃদ্ধির চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি প্রাইম ব্যাংকের আমানতে। ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। সাড়ে পাঁচ বছর পর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আমানতের পরিমাণ ২২ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মাঝে চার বছর প্রাইম ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক।
প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন ও নিট মুনাফার প্রবৃদ্ধিতেও ভাটা পড়েছে। ২০১৪ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬১৫ কোটি টাকা। এরপর টানা চার বছর প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৬০০ কোটি টাকার নিচে। ২০১৯ সালে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ২১ শতাংশ কমেছে।
পরিচালন মুনাফার চেয়েও খারাপ চিত্র নিট মুনাফায়। ২০১৪ সালে ২৩৯ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল প্রাইম ব্যাংক। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের পরিস্থিতিতে ফেরেনি। উল্টো চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফায় ৪৭ শতাংশ পতন হয়েছে।
লোকসান গুনছে প্রাইম ব্যাংকের দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানও, যা দুর্বল করে দিচ্ছে ব্যাংকের ভিত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ছে প্রাইম ব্যাংকের। আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো দেখাতে প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ অবলোপনের পথে হেঁটেছে ব্যাংকটি। ২০১৯ সাল শেষে মামলায় আটকা পড়েছে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ও অবলোপনকৃত ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে রাহেল আহমেদের হাতে প্রাইম ব্যাংকের ভিত দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাইম ব্যাংকের এমন অবস্থা নিয়ে কথা হয় গত তিন বছরে ব্যাংকটি ছেড়ে যাওয়া অন্তত এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তারা বলেন, অল্প বয়সে শীর্ষ নির্বাহী পদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন রাহেল আহমেদ। এজন্য নিজেকে অন্যদের তুলনায় ব্যতিক্রম ও অভিজাত মনে করতেন। এ মনোভাবের কারণেই ব্যাংকের কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ‘নিউ ব্লাড’-এর নামে প্রাইম ব্যাংকের পুরনো সব কর্মীকে তিনি ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। বেশি বেতন-ভাতা দিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে যাদের নিয়ে এসেছিলেন, তারা প্রাইম ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেননি। প্রাইম ব্যাংককে রাহেল আহমেদের ভুল নীতির খেসারত দিতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে।
ব্যাংক পরিচালনায় রাহেল আহমেদের নীতির সমালোচনা করে প্রাইম ব্যাংক ছেড়ে যাওয়া একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, রাহেল আহমেদ কর্মীদের বিভক্ত করে রাখতেন। তিনি ব্যাংকের কোনো উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিশ্বাস করতেন না। কথায় কথায় তিনি নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের অপমান করতেন। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নিয়ে আসা নিজের পছন্দের কিছু কর্মকর্তাকে দিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অপদস্থ করতেন। কর্মীদের সমন্বয়হীনতার কারণেই ব্যাংকটি এতটা পিছিয়েছে।










