দেশে চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেয়া ই-কমার্সের তালিকায় যোগ হলো আরো একটি প্রতিষ্ঠান ই-নিডজ ডটকমের নাম। করোনাকালে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষা উপকরণ প্রদানের মধ্য দিয়ে যাত্রা হয় প্রতিষ্ঠানটির। ই-নিডজ ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই ছুটে গিয়েছেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায়। পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে সুরক্ষা উপকরণ হস্তান্তরের পর সেই ছবি ও ভিডিও বেশ ঘটা করে প্রচার করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও তুলে দেয়া হয় সুরক্ষা উপকরণ।

এসব তথ্য পুঁজি করে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে ই-নিডজ ডটকম। এরপর চটকদার অফারের বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানের সাত শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

যানজটের শহর ঢাকা। রয়েছে নানা ধরনের দূষণ। এসব ঝক্কি-ঝামেলা এড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত পণ্য গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয় বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এক দশক আগে যাত্রা করলেও ই-কমাসের্র পালে হাওয়া লাগে মূলত করোনাকালেই। এ সময় চটকদার অফারের ঘোষণা দিয়ে আবির্ভাব ঘটে আরো কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু গ্রাহককে তার কাঙ্ক্ষিত পণ্য বা অর্ডারের বিপরীতে দেয়া অর্থ নির্ধারিত সময়ে ফিরিয়ে না দেয়ার অভিযোগ আসতে শুরু করে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

২ কোটি ২৮ লাখ টাকার পণ্য অর্ডার করা ১৫ জন গ্রাহক অভিযোগ করেন, ই-নিডজ থেকে পণ্য বা অর্থ কোনোটাই বুঝে পাননি তারা। পরে তাদের পক্ষ থেকে আব্দুল্লাহ আল নোমান জিয়ান নামের এক গ্রাহক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে মামলা করেছেন গুলশান থানায়। মামলায় ই-নিডজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুল কাইয়ুম, চেয়ারম্যান মো. ওয়াহিদ ইকবাল মার্শাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাহিদ ইকবাল, নাহিদ ইকবালের স্ত্রী নওমী আশরাফ, চেয়ারম্যান মার্শালের স্ত্রী সায়মা আফরিন ও হোসেইন রাহীকে আসামি করা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি নথিভুক্ত হয়। মামলার সঙ্গে ১৫ জন ভুক্তভোগী গ্রাহকের পণ্যক্রয়ের তালিকা সংযুক্তি হিসেবে দেয়া হয়েছে।

মামলার এজাহারে আব্দুল্লাহ আল নোমান জিয়ান উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকরা জানতে পারেন যে নিত্যব্যবহার্য পণ্য হাতের নাগালের মূল্যে সরবরাহ করছে ই-নিডজ ডটকম। পরে তাদের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হয়ে কিছু পণ্য অর্ডার করেন গ্রাহকরা। সিটি ব্যাংকের করপোরেট শাখার হিসাব নম্বরের মাধ্যমে ওইসব পণ্যের অগ্রিম টাকা পরিশোধ করেন। পরে কয়েক দফা সময় নিয়েও পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ডেট দিয়ে রিফান্ড চেক প্রদান করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ওই চেক জমা দিতে গিয়ে গ্রাহকরা জানতে পারেন ই-নিডজের ব্যাংক হিসাবে টাকা নেই। পরে তাদের অফিসে গিয়ে দেখেন তালাবদ্ধ। সেলফোন নম্বরগুলোও বন্ধ। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের অন্তত ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, ই-নিডজ ডটকমের পেজে গিয়ে তিনি দেখেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা থানায় থানায় ঘুরে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষা উপকরণ দিচ্ছে। আবার রাজনৈতিক নেতাদেরও সুরক্ষা উপকরণ দিচ্ছে। এসব কিছু দেখে তার মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছিল। সেই আস্থার জায়গা থেকেই তিনি পণ্য অর্ডার করেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য বুঝে না পেয়ে ই-নিডজের অফিসে যোগাযোগ করা হলে তারা তখন পণ্য ফেরত না দিয়ে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন।

ভুক্তভোগী ওই গ্রাহকের তথ্যের ভিত্তিতে ই-নিডজ ডটকমের ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা যায়, গত ২৮ জুলাই একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একটি থানায় উপস্থিত হয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার হাতে সুরক্ষা উপকরণ তুলে দিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও সিইও।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক ছাদেক মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ই-নিডজের সাত শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন এক ভুক্তভোগী। মামলাটির তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় বর্তমানে বন্ধ ও তাদের ফোনগুলোও বন্ধ থাকায় আসামিদের গ্রেফতার সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।