একটি পরিকল্পিত শহর গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত নিয়ম অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা। ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী, ভবনের সামনের রাস্তার প্রস্থ এবং ভবন ও রাস্তার মধ্যবর্তী উন্মুক্ত স্থানের যোগফলের দ্বিগুণের সমান উচ্চতায় ভবন নির্মাণ করতে হবে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের চিত্রটা উল্টো। কোথাও অনুমোদিত নকশার চেয়ে বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, কোথাও এক শ্রেণীর ভবনের অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আরেক শ্রেণীর ভবন। আবার কোথাও ভবনের নকশায় চারপাশে যতটা ফাঁকা জায়গার উল্লেখ করা হচ্ছে, বাস্তবে তা থাকছে না। এতে অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি ভূমিকম্পে ভবন ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।

পৌরসভার বাসিন্দারা বলছেন, গত দুই দশকে নগরায়ণ প্রসারিত হওয়ায় নতুন নতুন ভবন নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যেন অনেকটাই নীরব। তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা প্রশাসনেরও নেই দৃশ্যমান ভূমিকা। বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনকে আরো কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

জেলা নাগরিক ফোরামের সহসভাপতি নিহার রঞ্জন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্প্রতি থাইল্যান্ডে ভূমিকম্পে আমরা যা দেখতে পেলাম, সেই দিন হয়তো আমাদের জন্যও অপেক্ষা করছে। যদি এমন হয়, তাহলে এখানে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এখন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে অনেক উঁচু ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবন করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীতিমালা মানছে না।’

নগরায়ণের ফলে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার পরিধিও বাড়ছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। আর এসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কাঠামো, স্থাপত্য কৌশল, ভিত্তি কৌশল, অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, উচ্চগতির প্লাম্বিং ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের ছাড়পত্র, আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ও ইটিপি বাস্তবায়নসহ অন্যান্য নীতিমালা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রাজমিস্ত্রি দিয়ে কলাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে ইটের গাঁথুনির ওপর তৈরি করা হচ্ছে দোতলা ও তিনতলা ভবন। তবে এ ক্ষেত্রে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ নীরব থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

পরিবেশবাদী সংগঠন তরী বাংলাদেশের সভাপতি শামীম আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে দিন দিন ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। এতে আমাদের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভবন নির্মাণকাজ থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর কিছুদিন পর আবারো কাজ চালু হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে। আমরা জানি পুরো শহর তিনজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। তারাও বিভিন্ন সময় অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে ভবন নির্মাণের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহন ঢুকতে পারে না। আমরা চাই, পৌর কর্তৃপক্ষ যেন এ ব্যাপারে আরো কঠোর হয়।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার তথ্য বলছে, পৌরসভায় ৩০ হাজারের বেশি বাড়ির হোল্ডিং নম্বর রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভার নীতিমালা অনুযায়ী ছয়-১৪তলা ভবনকে বহুতল ভবন হিসেবে ধরা হয়। পৌরসভায় এমন বহুতল ভবনের সংখ্যা অন্তত দেড়শ শতাধিক। এসব ভবনের কোনোটির ছয়তলা অনুমোদন নিয়ে নয়তলা কিংবা ১০তলা করা হয়েছে।

নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে পৌরসভার প্রশাসক শংকর কুমার বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা অবৈধভাবে নির্মাণ করা ভবনের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েছি। শহরে যে নতুন ভবনগুলোর কাজ চলমান, যদি তারা নীতিমালা না মানে তাহলে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরেও পড়েছে। পৌরসভার অনুমোদন না নিয়েই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। যে ভবনগুলো হয়ে গেছে সেগুলোকে ভাঙার মতো যন্ত্রাংশ পৌরসভার নেই। তবু যে ভবনগুলো নতুন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলো যেন প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা অবস্থায় ব্যবস্থা নেয়া হয়, সে ব্যাপারে পৌর প্রশাসককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে অনুমোদন নিতে গেলে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’