রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ‘অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আজকাল লেখাপড়ার সঙ্গে সমঝোতা করে শিক্ষাবহির্ভূত কাজে সময় বেশি দিচ্ছে। যে কারণে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে প্রথম এক হাজারের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় না।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ষষ্ঠ সমাবর্তনে গতকাল তার ভাষণে এ কথা বলেন।

আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। পড়াশোনার জায়গা ঠিক রেখে তারপর রাজনীতি, সমাজসেবাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত করতে হবে। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে কোনোভাবে সমঝোতা করা যাবে না। কেবল সনদসর্বস্ব শিক্ষা দিয়ে দেশ ও জাতির উন্নতি করা যাবে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারলে তবেই তাকে সফল শিক্ষা বলা যায়।’

দলীয় লেজুড়বৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠে পাঠদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বলেন, ‘পত্রিকা খুললে এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য ও টেন্ডার বাণিজ্যের কথা উঠে আসে। ইদানী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আরো নেতিবাচক খবর দেখা যায়। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপাচার্য ও শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার খবর বড় করে ছাপা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। কিছু প্রতিবন্ধকীয় অপকর্ম ও অদক্ষতার খবর পুরো শিক্ষক সমাজের সম্মানকে ম্লান করছে। এছাড়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমি আশা করব, আমাদের সম্মানিত শিক্ষক সমাজ বিষয়টি ভেবে দেখবেন। নিজেদের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রাখবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন। এখানে তারা রাজনৈতিক অনুশীলন ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেন। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশও বজায় রাখতে হবে।’

রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘রাজনীতিতে অর্থ ও ক্ষমতার দাপট নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীর শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির কারণে ছাত্ররাজনীতিকে এখন মানুষ আগের মতো সম্মানের চোখে না দেখে নেতিবাচকভাবে দেখে। ব্যাপারটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুখকর নয়।’

রাষ্ট্রপতি এটিকে তার বিদায়ী সমাবর্তন আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিয়েও কথা বলেন। ব্যবসায়ী ও ঋণখেলাপিদের প্রসঙ্গে আবদুল হামিদ বলেন, ‘ব্যবসায়ীরাও ব্যবসা শুরু করেন নীতিনৈতিকতা বাদ দিয়ে। কীভাবে শুধু নিজে বড়লোক হওয়া যায় সেই চিন্তায় সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। খেলাপি ঋণের ১ শতাংশের জন্যও সাধারণ মানুষ দায়ী নয়। বরং বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপি হওয়ার জন্য। তারা ফেরত দেয়ার জন্য ঋণ নেয় না।’

দেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তুলতে হলে তরুণ সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজন নিরন্তর গবেষণা। এসব তরুণকে যথাযথ করে গড়ে তুলতে আমাদের বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

সমাবর্তন বক্তার বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘ব্যক্তিস্বার্থ মানুষকে অমানুষে পরিণত হতে প্ররোচিত করে। এছাড়া অর্থলোভী হতে, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও মানবিকতাবোধকে ধ্বংস করতে প্ররোচিত করে। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে মানুষের প্রতি কর্তব্য এবং সেবার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করতে হবে।’

জাবি উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-বিদেশে প্রভূত সুখ্যাতি অর্জন করেছে। বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী ও গবেষকের তালিকায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী ও শিক্ষার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমি প্রত্যাশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং এ পথ আরো প্রশস্ত হবে।’

সমাবর্তনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক শেখ মনজুরুল হক। এ সময় অন্যদের মধ্যে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদা আখতার, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বেলা আড়াইটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের নেতৃত্বে সমাবর্তনের শোভাযাত্রা বের হয়ে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে গিয়ে শেষ হয়। পরে বেলা ৩টায় রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের নেতৃত্বে আরেকটি শোভাযাত্রা সমাবর্তনস্থলে এসে শেষ হয়।

এবারের সমাবর্তনে ১৫ হাজার ২২৩ গ্র্যাজুয়েট অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্নকারী ১১ হাজার ৪৪৬ জন, এমফিল ডিগ্রির ৩৪, পিএইচডি সম্পন্নকারী ২৮১ ও সাপ্তাহিক কোর্সের (স্নাতকোত্তর) ৩ হাজার ৪৬২ জন। এছাড়া সমাবর্তনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বরধারী ১৬ শিক্ষার্থীকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়।