আসন্ন ঈদে কালোবাজারি ও ভোগান্তি রোধে রেলের সব ধরনের টিকিট বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নিয়ম চালুর কারণে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ই-মেইল ও সেলফোন নম্বর দিয়ে ভেরিফায়েড আইডি দিয়েই টিকিট কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। যার কারণে টিকিট কালোবাজারি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তবে হঠাৎ শতভাগ অনলাইন হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জটিলতায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে ঈদযাত্রায় রেলের টিকিট।
রেলের মতো একটি সর্ববৃহৎ গণপরিবহনের ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া প্রায় নিয়মিতই একের পর এক সিদ্ধান্ত দেয়া ও পরিবর্তনের কারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। এ কারণে আসন্ন ঈদ-পূর্ব রেলের টিকিট এখনো অবিক্রীত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। ঈদের ১১ দিন (যাত্রার দিনসহ) আগে অগ্রিম টিকিট বিক্রি, কাউন্টারের পরিবর্তে শতভাগ অনলাইনে টিকিটের কারণে অনেকেই ট্রেনের পরিবর্তে বিকল্প বাহনের দিকেও ঝুঁকছে।
সোমবার রাতে (৮টা ১ মিনিট) রেলের টিকিট বিক্রির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে দেখা যায়, টিকিট কেনার জন্য অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করেছে ১২ লাখ ১৮ হাজার ১৪৪ জন। ১২ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত রেলের টিকিট অবিক্রীত রয়েছে মোট ৯ লাখ ৪২ হাজার ৭২৩টি। এর মধ্যে ২১ এপ্রিলের টিকিট অবিক্রীত রয়েছে ৯৪ হাজার ৩৪৮টি, ২০ এপ্রিল ৮৮ হাজার ৪১৯, ১৯ এপ্রিল ৮৯ হাজার ৬৮৯, ১৮ এপ্রিল ৮৭ হাজার ৩৮৮, ১৭ এপ্রিল ৯৪ হাজার ৩০৭, ১৬ এপ্রিল ১ লাখ ১৩ হাজার ২০৬, ১৫ এপ্রিল ১ লাখ ২০ হাজার ৫৯, ১৪ এপ্রিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪১২, ১৩ এপ্রিল ৭৩ হাজার ৬০২ ও ১২ এপ্রিলের টিকিট অবিক্রীত রয়েছে ৬৯ হাজার ২৯৩টি।
রেলের ট্রাফিক অপারেশন বিভাগের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, ঈদযাত্রার টিকিট বিক্রির সময়ে প্রতিদিন অনলাইনে টিকিট কেনার জন্য ওয়েবসাইট ও অ্যাপে হিট হয়েছে দুই-আড়াই কোটিবার। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রির কারণে ডিজিটাল প্লাটফর্মে অনভ্যস্ত অনেকেই টিকিট কেনেনি বা টিকিট কিনতে সক্ষম হয়নি। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে শতভাগ টিকিট বিক্রির কারণে টিকিট কালোবাজারে বিক্রির প্রবণতা কমে এলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ কঠিন হয়ে গেছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। রেলের বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য বলছে, ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ বিক্রির কথা থাকলেও এ বছর অনেক টিকিটই অবিক্রীত থাকছে। ৭ এপ্রিল দেয়া ১৭ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি হয়েছে (সকাল ১০টা পর্যন্ত) ৪৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ ৭ এপ্রিল সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্য অভিমুখী ১০টি আন্তঃনগর ট্রেনের ৫১ দশমিক ৫০ শতাংশ টিকিটই অবিক্রীত ছিল। এছাড়া ৮ এপ্রিল অগ্রিম বিক্রি হওয়া ১৮ এপ্রিলের টিকিটের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অনেকটা একই চিত্র। ৮ এপ্রিল সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের আন্তঃনগর ট্রেনের ৬০ দশমিক ৬৮ শতাংশ টিকিট বিক্রি হলেও ৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ টিকিট অবিক্রীত ছিল। মূলত দেশের সার্বিক জনসংখ্যার তুলনায় মুষ্টিমেয় যাত্রী রেলওয়ের টিকিট সংগ্রহের জন্য রেজিস্ট্রেশন করায় ঈদযাত্রায় রেলের টিকিট বিক্রি কম হয়েছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেলের ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ কার্যক্রম শুরুর পর অ্যাপ, ওয়েবসাইট ছাড়াও সেলফোনের মাধ্যমে শুধু এসএমএস দিয়ে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। অনেক যাত্রী কাউন্টার থেকে টিকিট কেনার সুবিধার্থে ফিচার ফোনের মাধ্যমে এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। কিন্তু ঈদের সব টিকিট অনলাইনে বিক্রির ঘোষণা আসার পর এসব যাত্রী রেলসেবা অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে সেটি ভেরিফায়েড হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পুনরায় রেজিস্ট্রেশন কিংবা সেলফোন নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ না রাখায় ফিচার ফোনে একবার রেজিস্ট্রেশন করা অনেক যাত্রী এ বছর ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে পারছে না। তাছাড়া কয়েক বছর আগে রেজিস্ট্রেশন করার পর যেসব যাত্রীর সেলফোন নম্বর পরিবর্তন হয়েছে তাদের পুনরায় রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ না থাকায় ঈদযাত্রায় রেলের টিকিট কেনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদ-পূর্ব প্রতিদিন ২৫ হাজার টিকিট বিক্রি হলেও এ বছর নিয়মিত ২৫ হাজার ৯০০ টিকিট ও স্পেশাল ট্রেনের তিন হাজার টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। ঈদযাত্রার সব টিকিট অনলাইনে বিক্রি হলেও মধ্যবর্তী সময়ের টিকিটগুলো অনলাইনের পাশাপাশি কাউন্টার থেকেও বিক্রি করছে রেলওয়ে। এ কারণে ঈদের বিশেষ ট্রেনগুলোর টিকিট বিক্রিতে অ্যাপ কিংবা ওয়েবসাইটে অনলাইন ও কাউন্টারে টিকিট বিক্রি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণে অনেক যাত্রী অনলাইনের পাশাপাশি কাউন্টারে ঈদের টিকিট বিক্রি হচ্ছে ভেবে স্টেশনে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
ঈদের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের একাধিক অসংগতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা। তবে আগামী কয়েকদিন ঈদের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দূর করতে টিকিট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত সহজের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধান করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঈদের টিকিট শতভাগ অনলাইনে বিক্রি ও অবিক্রীত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ঈদের অগ্রিম টিকিট অনলাইনে বিক্রির কারণে কালোবাজারি প্রতিরোধ ছাড়াও মানুষের ভোগান্তি কমেছে। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে “টিকিট যার, ভ্রমণ তার” বাস্তবায়নের কারণে টিকিট ক্রয় কিছুটা জটিল হলেও একসময় মানুষ নতুন এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশে সব শ্রেণীর মানুষই এখন স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এর পরও অনলাইনে টিকিট বিক্রি, রেজিস্ট্রেশনে ই-মেইলের ব্যবহারসংক্রান্ত যেসব সমস্যা আছে সেগুলো ঈদের পর সমাধান করা হবে। যাত্রার আগ মুহূর্তে অবিক্রীত টিকিটও বিক্রি হয়ে যাবে।’
এদিকে রেলওয়ে কর্মচারীদের জন্য পাসের টিকিট সরবরাহের বিষয়ে রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় এখন পর্যন্ত বিশেষ এ টিকিট সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক (ট্রাফিক কমার্শিয়াল) নাহিদ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আগে পাসের কোটায় দেয়া হতো। “টিকিট যার, ভ্রমণ তার” নীতি বাস্তবায়নের কারণে সব টিকিটই অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। এর কারণে এখনো পাসের কোটায় টিকিট দেয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে রেলওয়ে কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে পাসের মাধ্যমে রেলওয়ে টিকিট পেয়ে আসার কারণে বিষয়টি বিবেচনায় আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এলে পাসের কোটায় টিকিট সরবরাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঈদ-পূর্ববর্তী সময়ের টিকিটগুলো বর্তমানে কাউন্টার ও অনলাইনে বিক্রি হওয়ায় ঈদযাত্রার টিকিটগুলোর ক্ষেত্রেও অনলাইন ও কাউন্টার অপশনটি দেখানো হচ্ছে। এটা একটি ভুল। সহজের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মামুন অভিযোগ করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে রেলওয়ে ঈদের সব টিকিট অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি প্রশংসনীয় হলেও রেলওয়ে কর্মচারীরা ঐতিহ্যগতভাবে বিশেষ পাসের মাধ্যমে পাওয়া টিকিট দিচ্ছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেল কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ টিকিট অনলাইনে বিক্রি না করে বিশেষ কোটায় ব্লক করে রাখলেও রেলওয়ে কর্মচারীদের পাসের টিকিট দেয়া হচ্ছে না। ঈদযাত্রা সফল করতে রেলওয়ে কর্মচারীরা ঈদের আগের দিন পর্যন্ত দিন-রাত পরিশ্রম করে ইঞ্জিন, কোচ, রেলপথসহ বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত ও সচল রাখতে কাজ করে যায়। কর্মচারীদের পাস দেয়া থাকলেও অনলাইনে পাসের বিনিময়ে টিকিট ইস্যু করতে না পারায় রেলওয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।’
রেলের পরিবহন বিভাগ বলছে, এ বছর রেলের মাধ্যমে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হবে না। এ কারণে দেশের সর্ববৃহৎ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ছাড়াও বিভিন্ন রেলস্টেশনে বিশেষ প্রতিরক্ষা চালু করতে যাচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে নিয়মিত টিকিটের পাশাপাশি স্পেশাল টিকিট ছাড়াও স্ট্যান্ডিং টিকিটের মাধ্যমে সক্ষমতার কয়েক গুণ যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করেছে। এ কারণে বিগত কয়েকটি ঈদের পূর্ববর্তী ট্রেনগুলোয় যাত্রীচাপের কারণে ট্রেনের কোচ ও ইঞ্জিন ফেইলিউরের (যাত্রাপথে অকেজো হয়ে পড়া) ঘটনা ঘটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা প্রতিরোধে রেলওয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও অনলাইনে টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় ঈদযাত্রায় ট্রেনবিমুখী হয়েছে সাধারণ যাত্রীরা।










