সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয়ে বিশেষ সুবিধার আওতায় দেয়া ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দ্য সিটি ব্যাংকের ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের শেষ থেকে চলতি বছরের প্রথম দিক পর্যন্ত এসব ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা হয়েছিল। ব্যাংকের নিজস্ব অনুসন্ধান বলছে, মোট ১৩টি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে এসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে, সব তথ্য যাচাই-বাছাই না করে কার্ড ইস্যু করাই এ ঘটনার অন্যতম কারণ।

সাধারণত গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড সুবিধা পেতে বৈধ উপার্জনের প্রমাণপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নানা ধরনের কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। এর পরই পাওয়া যায় বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ড। তবে বিভিন্ন ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এসব শর্ত শিথিলযোগ্য। এটিকে বিশেষ সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করে  ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে দ্য সিটি ব্যাংক। কম সময়ে সর্বোচ্চ সেবা প্রদানই বিশেষ এ সুবিধার মূল উদ্দেশ্য। মৌলিক কিছু কাগজপত্র দাখিল সাপেক্ষেই এ সুবিধার আওতায় স্বল্পতম সময়ে ক্রেডিট কার্ড পান সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এমনকি দ্রুততম সময়ে কার্ড সরবরাহের জন্য কিছু ক্ষেত্রে দেয়া হয় বিশেষ ছাড়।

দ্য সিটি ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের শেষ থেকে এ বছরের প্রথম নাগাদ নয়জন গ্রাহকের নামে ১৩টি কার্ড ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিএম এসকে জাহাঙ্গীর হোসেনের নামে ইস্যু করা হয় তিনটি কার্ড। আবেদনটি ব্যাংকে জমা হয় গত ২২ জানুয়ারি। আর তা অনুমোদন হয় পরদিন ২৩ জানুয়ারি এবং ওইদিনই গ্রাহককে কার্ড সরবরাহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কার্ডটি চালু করেন ওই গ্রাহক। তার কার্ডে সীমা বেঁধে দেয়া ছিল ৮ লাখ টাকা।

এভাবে পর্যায়ক্রমে নয়জন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নামে কার্ড ইস্যু করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কার্ড থেকে খরচ করা অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে অনুসন্ধান চালায় দ্য সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, ১৩টি কার্ডের জন্য যে আবেদনগুলো জমা পড়েছিল তার সবগুলোতেই মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এরা কেউই সরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা নন। মূলত একটি চক্র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে কার্ড নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ৫৭ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য কার্ডহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা করেছে দ্য সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ১ মে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আইন শাখার ম্যানেজার সহিদ-উল-হক বাদী হয়ে এ মামলা করেন। অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে দায়ের করা মামলায় সরকারি কর্মকর্তার ছদ্মবেশ ধারণ করে জাল দলিলকে খাঁটি দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড দেশের বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর কার্যক্রম শুরু হয়। সিটি ব্যাংক ব্যবসায়িক নীতিতে পরিমার্জন সাপেক্ষে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে কম সময়ে সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য মৌলিক কাগজপত্র দাখিল সাপেক্ষে এবং কিছু ক্ষেত্রে ছাড়ের সুযোগ রেখে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু অতিসম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে মোট ১৩টি কার্ডের বিপরীতে ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ধারণা, টাকার অংক আরো বেশি হতে পারে।

সাধারণত আবেদন কয়েক স্তরের যাচাই শেষেই গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা যাচাই করার পাশাপাশি তার কর্মস্থল-সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতাও দেখা হয়। তদন্তে দেখা গিয়েছে, সিটি ব্যাংকের যেসব ক্রেডিট কার্ডে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেয়া হয়েছিল। এমনকি কিছু কার্ড আবেদনের একদিনের মধ্যে ইস্যু এবং গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে কার্ড সরবরাহ করতে গিয়ে গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ের যথাযথ প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা হয়নি। ফলে প্রতারক চক্রটি খুব সহজেই ১৩টি ক্রেডিট কার্ড পেয়ে যায় এবং সেখান থেকে অর্থ তুলে নেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিপন কুমার বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সেজে সিটি ব্যাংকের ১৩টি ক্রেডিট কার্ড নেয় প্রতারক চক্র। এসব কার্ড থেকে এখন পর্যন্ত ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। অজ্ঞাত আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।