ময়মনসিংহের ভালুকায় ২০০৪ সালে বস্ত্র শিল্পের কারখানা স্থাপন করেন দেশের অন্যতম একজন উদ্যোক্তা। পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ এ বস্ত্র কারখানা সম্প্রসারণে ২০১৯ সালে উদ্যোগ নেন তিনি। কভিডের প্রভাবে এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন স্লথ হলেও গত সেপ্টেম্বরে এটির গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করা হয়। তবে শিল্প সম্প্রসারণের জন্যও কোনো গ্যাস সংযোগ না দেয়ার বিষয়ে ডিসেম্বরে নেয়া সরকারের এক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে থমকে যায় সংযোগপ্রাপ্তির আবেদন। এতে ভালুকার ওই শিল্প-কারখানার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন ব্যাহত হচ্ছে।
২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোনো শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না জানিয়ে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এক আদেশ জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। যদিও বেসরকারি কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়া অন্যগুলোতে শিল্প-কারখানা এখনো পূর্ণ উৎপাদনে আসতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে শিল্প সম্প্রসারণে বা নতুন গ্যাস সংযোগ না দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত টেক্সটাইল শিল্পের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নকে ব্যাহত করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্র বলছে, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি অনুষঙ্গ। বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলোকে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এখনো ন্যূনতম পাঁচ থেকে সাত বছর সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে টেক্সটাইল খাত এখনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে প্রস্তুত না। কিন্তু আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত আরোপিত বিধিনিষেধ এ শিল্পের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে।
টেক্সটাইল মিল মালিকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পছন্দ ও চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে নকশায়ও পরিবর্তন ও ভিন্নতা আসছে। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সক্ষমতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। এজন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন। এ কারণেই মন্ত্রণালয়ের আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন খাতটির উদ্যোক্তারা।
জ্বালানি সচিবসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও বিষয়টি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে বাইরের কাউকে না দেয়ার বিষয়টি যৌক্তিক হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলেই এখনো গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে নতুন করে গ্যাস বা সম্প্রসারণের জন্য সংযোগ না দেয়া কতটা যৌক্তিক—এমন প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আলমগীর শামসুল আলামিন বণিক বার্তাকে বলেন, টেক্সটাইল খাতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ এ মুহূর্তে সরকার দিচ্ছে না। আমরা মনে করি, এটা টেক্সটাইলের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের পরিপন্থি। দেশের টেক্সটাইল শিল্প পোশাক খাতের ব্যাকবোন। রফতানি বৃদ্ধির স্বার্থেই টেক্সটাইলের উন্নয়ন প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত টেক্সটাইলের সম্প্রসারণের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড পরিস্থিতিকেই শুধু বিবেচনায় নিলে টেক্সটাইল শিল্প এগোতে পারবে না। একটা টেক্সটাইল মিল স্থাপনেও দুই থেকে আড়াই বছর সময় লেগে যায়। এখন থেকেই যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, তাহলে দুই-আড়াই বছর পিছিয়ে যাব। তাই বর্তমান সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হলে খাতটির জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। পরিকল্পিত শিল্পায়ন অবকাঠামো গড়ে তোলার পর সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু এর আগেই বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের হতাশা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।
বিটিএমএ পরিচালক ও মোশাররফ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে গ্যাস সংযোগ সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি যে অ্যালটমেন্টগুলোতে অনুমোদন দিয়েছে, সেগুলোর সংযোগ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে অনেক সময় লাগছে। নতুন কোনো সংযোগের প্রক্রিয়া এখন বন্ধ আছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে যে টেক্সটাইল মিলগুলো হয়েছে, সেগুলো এলোমেলোভাবেই হয়েছে। এখন নীতিনির্ধারক ও খাতসংশ্লিষ্টরা পরিকল্পিত শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা বিভিন্ন স্থানে শিল্প স্থাপন এরই মধ্যে করে ফেলেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মিল-পার্শ্ববর্তী জমি কিনে সেখানেই সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছেন। এ সম্প্রসারণ করা সক্ষমতার জন্যই এখন গ্যাস সংযোগ দরকার। এ সম্প্রসারণগুলো বন্ধ রাখা শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে সঠিক না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়ার আপাতত কোনো সুযোগ নেই। নতুন যেসব শিল্প-কারখানা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোয় এলএনজির ব্যবহার উৎসাহিত করছি আমরা।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে পরিচিত প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে সুতা ও কাপড়ের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আছে ১ হাজার ২৩২টি। এছাড়া কাপড় প্রক্রিয়াজাত করার ডায়িং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিল আছে আরো ২৪৪টি। এ মিলগুলো দেশের রফতানিমুখী নিট পোশাক কারখানাগুলোর প্রয়োজনীয় সুতার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে। আর রফতানিমুখী ওভেন পোশাক পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে। এ শিল্পে মোট বিনিয়োগ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি।










