বাংলাদেশে বাস্তবায়িত বড় বড় অবকাঠামো বা মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই দুর্নীতি এবং অদক্ষতার কারণে অপচয় হচ্ছে। এছাড়া উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ করায় ব্যয় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছ চুক্তিগুলো দেশের জনঋণ ব্যবস্থাপনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনসের সহায়তায় থিংক অ্যান্ড ডু ট্যাংক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গবেষণায় উঠে আসে এসব তথ্য।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রকল্পের সুশাসন এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রভাব’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান।
উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। ১৬ বছরে ঋণের এ বৃদ্ধি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ বা পাঁচ ভাগের এক ভাগ ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে। ডলার আয়ের তুলনায় ঋণের দায় ১৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ এখন নিম্ন ঝুঁকি থেকে ‘মাঝারি ঝুঁকির’ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গবেষণায় ৪২টি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতি অনুসরণ না করে সরাসরি বা জিটুজি চুক্তিতে যাওয়ার ফলে প্রকল্পের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যে কাজ সাশ্রয়ী মূল্যে করা সম্ভব, প্রতিযোগিতার অভাব এবং শর্তযুক্ত ঋণের কারণে সেই একই কাজে চার গুণ পর্যন্ত বেশি খরচ দেখানো হচ্ছে। এছাড়া ২৯টি মেগা প্রকল্পের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গড়ে প্রকল্পগুলোর ব্যয় বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি এবং বাস্তবায়নকাল দীর্ঘায়িত হয়েছে গড়ে পাঁচ বছর। অতিমূল্যায়িত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো সাশ্রয়ী রাখার জন্য বার্ষিক প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন চার গুণ বাড়লেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে দেয়া পেমেন্ট বেড়েছে ১১ গুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাড়া দেয়ার পরিমাণ বেড়েছে ২০ গুণ। ভারতের আদানি গড্ডা প্রকল্পের উদাহরণ টেনে বলা হয়, এই একটি প্রকল্প থেকেই বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশকে ভারতের স্থানীয় গ্রিডের চেয়ে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এর ফলে আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত গচ্চা দিতে হতে পারে।
সংকট কাটাতে অর্থনীতিবিদরা সুপরিকল্পিত সুশাসন কাঠামোর ওপর জোর দিয়েছেন। এ প্রস্তাবের মূলে রয়েছে ছয় মাসের মধ্যে একটি স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে গোপন ও দ্বিপক্ষীয় ঋণের প্রকৃত তথ্য প্রকাশ এবং দুর্নীতির প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যয়বহুল চুক্তিগুলো পুনরায় নির্ধারণ বা বাতিল করা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতের বোঝা কমাতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রথা বাতিল করে প্রকৃত সরবরাহের ভিত্তিতে অর্থ প্রদান এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বদলে বিশেষজ্ঞনির্ভর ‘এনার্জি ওভারসাইট কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।










