ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পুরনো একটি মাঠ—ধূপখোলা খেলার মাঠ। এ মাঠের চারপাশ ঘিরে ছিল ৩৯৪টি দোকান। ২০১৮ সালে মাঠটি সংস্কার করে শিশুপার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। কিন্তু এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে মাঠ সংস্কার ও মার্কেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। এরও তিন বছর পর ২০২১ সালে মাঠ সংস্কার ও মার্কেট নির্মাণের প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। মাঠ অনেকটা প্রস্তুত হলেও মার্কেট প্রস্তুত হতে আরো সময় লাগবে। ফলে নির্ধারিত সময়ে দোকান বুঝে পাওয়ার ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি হতাশ।
সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে মার্কেট নির্মাণে এমন ধীরগতির অভিযোগ আরো রয়েছে। এছাড়া নির্মিত মার্কেটে দোকান বরাদ্দ নিয়েও রয়েছে বিস্তর অনিয়ম। সম্প্রতি আগুনে ছাই হওয়া বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা ডিএসসিসি ও ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশ সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট থেকে সরে যাননি মূলত এ কারণেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের ব্যাপারে ডিএসসিসি তাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ডিএসসিসি পরিচালন নীতির দুর্বলতাই বঙ্গবাজার মার্কেটের ব্যবসায়ীদের আগুনে সর্বস্বান্ত হওয়ার পেছনে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলেও তারা মনে করছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ের মধ্যেই মার্কেট এবং সুষ্ঠুূ প্রক্রিয়ায় দোকান বরাদ্দ দেয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে ডিএসসিসি।
ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির আওতাভুক্ত অনেক মার্কেটের নির্মাণকাজ বছরের পর বছর মামলার কারণে আটকে আছে। আবার অনেক পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট সংস্কার শুরু করা যাচ্ছে না ব্যবসায়ীদের অসহযোগিতায়। এমনই একটি মার্কেট ছিল বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স। ১৯৯৫ সালে সংস্থার নিজ খরচে নির্মাণ করা ১ দশমিক ৭৯ একর আয়তনের এ মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বহুদিন। এটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজাইনও পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের করা মামলার কারণে বন্ধ হয়ে যায় মার্কেট সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজ। গত মঙ্গলবার ভোরের আগুনে মার্কেটটি পুরোপুরি পুড়ে যায়।
ডিএসসিসির অন্তত ১০টি মার্কেটের নির্মাণকাজ বিভিন্ন কারণে বন্ধ আছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল ও কাপ্তানবাজারের দুটি বহুতল মার্কেট। এ মার্কেট দুটি নতুন করে তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসসিসি। ২০১৭ সালের শেষে শুরু হয়ে দুই বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী দোকান বরাদ্দ দিয়ে পুরো টাকা নিয়ে নেয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়া হয় কাজ। এরপর ছয় বছর পার হলেও দোকান বুঝে পাওয়া তো দূরের কথা, বেজমেন্টের কাজও শেষ হয়নি। এত টাকা বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছেন দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যবসায়ীরা।
বঙ্গবাজার মার্কেটের ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের পরিচালন নীতির দুর্বলতার কারণে বারবার বলা সত্ত্বেও তারা এ মার্কেট ছেড়ে যেতে রাজি হননি। মার্কেটটির ৩৬ ও ৩৭ নম্বর দোকান মালিক মো. হানিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অন্যতম পাইকারি মার্কেট ছিল এই বঙ্গবাজার মার্কেট। এখন আমরা যদি পজিশন ছেড়ে দিই তাহলে কবে আবার দোকান শুরু করব, আদৌ শুরু করতে পারব কিনা এটা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছিলাম। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের অনেক মার্কেট বছরের পর বছর লেগে গেলেও নির্মাণকাজ শেষ হয় না। দোকান বরাদ্দ দেয়া নিয়েও হয় অনিয়ম। সিটি করপোরেশন আমাদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বলেই আমরা সিটি করপোরেশনেকে বিশ্বাস করিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা লাইসেন্সধারী বৈধ ব্যবসায়ী। এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সিটি করপোরেশন কি আমাদের খোঁজ নিচ্ছে? উল্টো ব্যবসায়ীরা দৌড়াদৌড়ি করছেন। কোনো আদর্শ করপোরেশনের চিত্র তো এ রকম হতে পারে না।’
কথা হয় ৩৫ নম্বর দোকানের মালিক মো. শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। তিনিও বলেছেন একই কথা। ‘মার্কেট ছেড়ে দিলে সে মার্কেট আবার ফিরে পাব তার নিশ্চয়তা তো আমরা পাই না। সিটি করপোরেশনের আগের চিত্র তো ভালো না। এখন এসব বলে আর কী লাভ। দিন শেষে আমাদের মাথায়ই হাত পড়ল।’
বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ যৌক্তিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ব্যবসায়ীদের ভরসার জায়গা হতে পারেনি—এ অভিযোগ সত্য। ফলে আজকের এ মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি আমরা। বর্তমান মেয়র, প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এখন বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে ভাবছেন। এবার আশা করা যায়, আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠবে ডিএসসিসি।’
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশন নয় বরং দেশের সর্বত্রই আজ আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা এর আগে দেখেছি, খোদ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেই মার্কেটের সংরক্ষিত স্পেসকে দোকান হিসেবে বরাদ্দ দিয়ে দিতে। আমরা দেখেছি, যেখানে মার্কেটের নিরাপত্তার স্বার্থে খোলা জায়গা কিংবা চলাচলের পথ কিংবা বেসমেন্ট থাকার কথা সেখানে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেই দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আবার অনেক সময় দেখা গিয়েছে ভবনের কাজ শুরু করার পর মাঝপথে ঠিকাদারের কোনো খোঁজ থাকে না। সিটি করপোরেশনও এ বিষয়ে চুপ থাকে—তখন তো বলতেই হয় ব্যবসায়ীদের অনাস্থা অমূলক নয়। এ দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য মার্কেটের স্বত্বাধিকারী হিসেবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অগ্নিঝুঁকি কমানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল।’
অগ্নিকাণ্ডের পেছনে মার্কেট ভেঙে বহুতল ভবনে ব্যবসায়ীদের বাধার কথা বলে ডিএসসিসির দায় এড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এ মার্কেট অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত করা যেত। কিন্তু আমরা মনে করি, ডিএসসিসির সে সদিচ্ছার খুব অভাব ছিল। হাইকোর্ট যেখানে ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার জন্য নির্দেশ দিয়েছে ডিএসসি তো সে নির্দেশ উপেক্ষা করে অহরহ ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙছে, পার্কে দোকান বরাদ্দ দিচ্ছে। সেখানে হাইকোর্ট আটকালো না, মার্কেটে এসে হাইকোর্ট আটকে দিল ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের? এটা কেমন কথা? হাইকোর্ট কি বলেছে, এ মার্কেটে অগ্নিঝুঁকি কমানো যাবে না? তাহলে এগুলো কীভাবে করল ডিএসসিসি? সিটি করপোরেশন কোনোভাবেই বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না।’
সার্বিক বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা আস্থা পায়নি এ ধরনের কথার কোনো ভিত্তি নেই। আমি নিজে পাঁচটি মার্কেটের দোকান বরাদ্দ দিয়েছি। সবাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। আগে কী হয়েছে, সে কথা এখন বলে লাভ নেই। বর্তমান মেয়রের সময়ে এ ধরনের কোনো অনিয়ম ঘটেছে কিনা সেটা দেখান। দোকান বরাদ্দের ব্যাপারে আমরা ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি।’










