দেশে গত এক দশকে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি এ খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসাও স্ফীত হয়েছে। তবে চলতি বছরের মার্চে দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। দুই মাসেরও বেশি সময় সাধারণ ছুটি থাকাকালীন বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। তবে জুন থেকে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ধীরে ধীরে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়তে থাকে। যদিও কভিডের প্রভাবে এখনো মন্থর গতি দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের নয়টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। চলতি ২০২০-২১ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কোম্পানিগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসময়ে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) ব্যবসা ও মুনাফা দুটোই কমেছে। অন্যদিকে বারাকা পাওয়ার লিমিটেড, ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড ও জিবিবি পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবসা কমলেও মুনাফা বেড়েছে। তবে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল) ও সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবসা বাড়লেও কমেছে মুনাফা। আর এ সময়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (এসপিসিএল) ও ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ইউপিজিডিসিএল) ব্যবসা ও মুনাফা দুটোই বেড়েছে।
এ বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বারাকা পাওয়ার ১২৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করেছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ছিল ১৬৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে ২৩ শতাংশ। অবশ্য উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে এ সময়ে কোম্পানিটি আগের বছরের তুলনায় ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ মুনাফা প্রবৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
বারাকা পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আয় কমেছে। তবে এ সময়ে প্রকৌশলীদের কাজে লাগিয়ে নিয়মিতভাবে প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এগুলোর দক্ষতা বাড়িয়েছি। এর ফলে আমাদের ব্যয় অনেক কমেছে। এজন্য ব্যবসা কমলেও এ সময়ে আগের তুলনায় মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়েছি।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ডেসকোর চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ১ হাজার ২১৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মূলত চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটির বিদ্যুৎ বিক্রির পরিমাণ কমেছে। রাজস্ব আয় কমায় এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে ১০ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ডরিন পাওয়ারের রাজস্ব আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৮২ কোটি ৯১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৯৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় কমেছে ৬ শতাংশ। অবশ্য আর্থিক ব্যয় কম হওয়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ২৯ কোটি ১৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
জিবিবি পাওয়ার চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ছিল ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। উৎপাদন, প্রশাসনিক, আর্থিক ও অন্যান্য ব্যয় কমানোর মাধ্যমে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কেপিসিএলের রাজস্ব আয় হয়েছে ২৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় বেড়েছে ২৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৯৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
শাহজীবাজার পাওয়ার চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ২৩২ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ছিল ১৮০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। আর এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা আগের তুলনায় ৫২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়ে ২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
জানতে চাইলে শাহজীবাজার পাওয়ারের কোম্পানি সচিব ইয়াসিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কভিডের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কমলেও আমাদের কেন্দ্রগুলো থেকে সরকারের বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ কমেনি। পাশাপাশি আমাদের সহযোগী কোম্পানি মিডল্যান্ড পাওয়ারের আয়ও বেড়েছে এ সময়। এছাড়া আমাদের রিফাইনারির জন্য এ সময়ে বেশি কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পেরেছি, ফলে সেখান থেকে আয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমাদের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
সামিট পাওয়ারের রাজস্ব আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে ২১১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিডের রাজস্ব আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৫৯৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় হয়েছিল ৫৪৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
ইউনাইটেড পাওয়ার চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৯২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছিল ২৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় বেড়েছে ২৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি কোম্পানিটির ঈর্ষণীয় মুনাফা প্রবৃদ্ধিও হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮১ শতাংশ বেড়ে ২৯৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম ও জামালপুরের ৪১৫ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯৯ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে ইউনাইটেড পাওয়ার। মূলত নতুন দুই বিদ্যুৎকেন্দ্র অধিগ্রহণের কারণেই চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব আয় ও মুনাফায় বড় অংকের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।










