ছয় শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্মৃতি রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভাটপাড়ায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু স্মৃতিসৌধের পাশে শহীদদের নামসংবলিত কোনো ফলক স্থাপন করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ভাটপাড়া নীলকুঠিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র স্থাপন করে নয় মাস এলাকায় গণহত্যা, নির্যাতন, নৃশংসতা চালায়। পাকিস্তানিদের নৃশংসতার মধ্যেও ভাটপাড়া ও এর কাছের গ্রামগুলোয় জ্বলে ওঠে প্রতিরোধ যুদ্ধের অগ্নিশিখা। একাত্তরের ৬ আগস্ট রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ভাটপাড়া ক্যাম্পে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের সংগঠক গাংনী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেম সরকার, শিক্ষক হাফিজ উদ্দীন, সাহার বাটী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এম লাক হোসেন, সমাজসেবক উজির আলি মালিথা, হারিস উদ্দীন ও আবুল কাশেমকে। হত্যার পর তাদের মরদেহ ভাসিয়ে দেয়া হয় পাশের কাজলা নদীতে। পরিবারের সদস্যরা তাদের মরদেহেরও সন্ধান পায়নি। তাদের সবার পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন।
ভাটপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রহিম জানান, ভাটপাড়া নীলকুঠিতে হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করত। পাশাপাশি এলাকার ছয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে
ধরে এনে নৃশংসভাবে হত্যা করে কাজলা নদীতে ফেলে দেয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যে স্থানে মরদেহগুলো ফেলে দেয়া হয় সে স্থানটি চিহ্নিত করে স্মৃতিসৌধ স্থাপনের দাবি করা হয়েছে। স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হলেও নামফলক না হওয়ায় শহীদ পরিবারগুলোর মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
শহীদ এমলাক হোসেনের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি
ভারতে ট্রেনিংরত অবস্থায় জানতে পারি বাড়ি থেকে আমার বাবাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করে তার মরদেহ বর্তমান স্মৃতিসৌধের স্থান কাজলা নদীতে বাঁশ দিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। যুদ্ধ-পরবর্তী আমরা সেখান থেকে উদ্ধার করি হাড়গোড় মেহেরপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আবদুল্লাহ আল-আমিন বলেন, ‘শহীদ
বুদ্ধিজীবীদের আত্মনিবেদন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বলিষ্ঠ প্রত্যয় এবং স্বাধীনতাকামী জনতার স্বপ্ন-শপথে উজ্জ্বল হয়ে আছে ভাটপাড়া ও তত্সংলগ্ন গ্রামগুলোর ইতিহাস। শহীদের রক্তভেজা কাজলার দুই পাড়ের গ্রামগুলোর গৌরবগাথা দেশের নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা দরকার। যেসব বুদ্ধিজীবী ও প্রতিরোধযোদ্ধা স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের জীবন দান করেছেন, তাদের অনেকের ভাগ্যে আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি। শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া দরকার। ভাটপাড়া স্মৃতিসৌধের পাশে অথবা সংরক্ষিত বধ্যভূমিতে শহীদদের নামসংবলিত একটি ফলক স্থাপনেরও জোর দাবি জানাই। বিজয় দিবস উপলক্ষে এবার ১৭ ডিসেম্বর দিনব্যাপী ভাটপাড়া গ্রামে অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে তাদের স্মরণ ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা দেয়া হবে।’
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী খানম বলেন, ‘ঠিক কী কারণে শহীদ স্মৃতিসৌধের নামকরণ করা হয়নি তা আমার জানা নেই। আমি আসার আগেই এটা নির্মিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










