নৌ ও আকাশপথেও ছিল না বড় কোনো দুর্ভোগ। দুই মাস পর ঈদুল আজহায় দেখা গেল উল্টো চিত্র। অতিরিক্ত ভাড়া, কাউন্টারে বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, রাস্তায় ‘মাইলের পর মাইল’ যানজট, ট্রেনে উপচে পড়া ভিড়, দুর্ঘটনা, প্রাণহানি আর বিশৃঙ্খলাকে সঙ্গী করে এবার ঈদ উদযাপন করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরলেন মানুষ।
বাড়ি ফেরা মানুষের অভিযোগ, এবারের ঈদযাত্রার প্রতি পদে পদে ছিল ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। অন্তর্বর্তী সরকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় যেমন ঠেকাতে পারেনি, তেমনি সড়ক-মহাসড়কগুলোও নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। যাত্রীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দিতে না পারার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। যদিও দুর্ভোগের জন্য তারা বৃষ্টি ও ঈদের আগে ‘সীমিত’ ছুটিকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রায় জনদুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। বিষয়টি দুয়েকদিনের মধ্যেই মূল্যায়ন করে ফিরতি ঈদযাত্রায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
ঈদযাত্রার ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকলে তা দ্রুত মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনিক যত্নের যদি অবহেলা দেখা যায়; যদি দেখা যায় সত্যিকার অর্থে তাদের প্রেজেন্স, তাদের অ্যাকটিভ ইনভলভমেন্টটা কম ছিল; তাহলে অবশ্যই বলা যাবে যে এ জায়গায় গাফিলতির জন্য জনদুর্ভোগ হয়েছে। এটা যদি আমরা দুয়েকদিনের মধ্যেই মূল্যায়ন করতে পারি, তাহলে সে তথ্যটা ফিরতি ঈদযাত্রায় কাজে লাগানো জরুরি। ঈদযাত্রায় যে দুর্বলতাগুলো ছিল সেগুলো সম্পর্কে প্রশাসনকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্কতামূলক বার্তা দেয়াও জরুরি।’
এবারের ঈদে সরকারি ছুটি ১০ দিনের। এর সঙ্গে মিল রেখে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সমপরিমাণ ছুটি দিয়েছে। দীর্ঘ ছুটি হলেও ঈদের আগে ‘বাড়ি ফিরতে’ মানুষ সময় পেয়েছেন মূলত দুইদিন। বেশির ভাগ মানুষ গত বুধবার (৪ জুন) থেকে যাতায়াত শুরু করেন। ওইদিন থেকেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় দেখা দেয় যানজট। ট্রেনের শিডিউল ঠিক থাকলেও অতিরিক্ত মানুষের চাপে নাজেহাল হতে শুরু করেন যাত্রীরা।
ঈদে যাতায়াত করা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হয়েছে উত্তরাঞ্চলের সড়কপথে। বুধবার রাত থেকেই যমুনা সেতু এলাকায় ২৫ কিলোমিটার যানজট দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার থেকে যানজট ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সিংহভাগ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যানজটের কারণে রাস্তায় থাকা যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগে পড়েন। বাস আটকে থাকায় কাউন্টারগুলোয়ও বাড়তে থাকে যাত্রীদের ভিড়। ৮-১০ ঘণ্টার পথ দ্বিগুণ সময়ে অর্থাৎ ১৫-২০ ঘণ্টায় পাড়ি দিয়েছেন বেশির ভাগ যাত্রী। কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায় ছিল আরো ৫-৭ ঘণ্টার দুর্ভোগ। যানজটে রাস্তায়
বাস আটকে থাকায় অনেক বাসের যাত্রা বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, রাস্তায় বিকল হয়ে কিংবা দুর্ঘটনায় দীর্ঘ সময় যানবাহন পড়ে থাকলেও তা উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন তৎপরতা ছিল না। সড়কের পাশে পশুর হাট ঠেকাতেও ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো যানজটমুক্ত রাখতেও ছিল ব্যর্থতা। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে চলাচল করেছে এবং এসব যানবাহন বিকল হয়েই বাড়িয়েছে যানজট। ট্রেনের ‘স্ট্যান্ডিং’ যাত্রীদের চাপে টিকিটধারীরা স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদেও যাতায়াত করেছেন অনেকে। একাধিক সড়ক ও রেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানিও হয়েছে। গত ঈদুল ফিতরে যাতায়াত ও ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন যতটা তৎপর ছিল, এবার ততটা তৎপরতা ছিল না বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান যদিও দাবি করেছেন এবার ঈদযাত্রা ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় কোনো কমতি ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অ্যাফোর্ট রোজার ঈদের মতোই আছে। কিন্তু এবার দুটো ফ্যাক্টর পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। একটা হলো ঈদের আগে মাত্র দুইদিনের ছুটি, আরেকটা বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে সড়কে যানবাহনের ধীরগতি হয়েছে। তারপরও যেহেতু যাত্রীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা প্রদান করতে পারিনি, এজন্য আমরা দুঃখিত। বৃষ্টির জন্য হোক, ছুটির কারণেই হোক—এটার (জনদুর্ভোগ) দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে।’
ফাওজুল কবির আরো বলেন, ‘ঈদযাত্রার ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে আমি নিজে ফিল্ডে গেছি। আমাদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও গিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে রিপোর্ট করছেন। জনদুর্ভোগের যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোকে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলব না। কিছু ঘটনা আছে যেখানে দুর্ভোগ-ভোগান্তি হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নই হয়েছে বলা যায়। পদ্মা ও যমুনা সেতু দিয়ে এ কয়েকদিনে কত যানবাহন পার হয়েছে, তার পরিসংখ্যানেই কিন্তু বিষয়টা বোঝা যায়। ঘরমুখী মানুষের বড় অংশই কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হয়নি।’










