সিটি করপোরেশনের নিয়মিত কার্যক্রমের একটি মশক নিয়ন্ত্রণ। নগরবাসীকে মশা ও মশাবাহিত রোগ থেকে নিরাপত্তা দিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের রয়েছে নানা কর্মযজ্ঞ। কীটনাশক ছিটানোর পাশাপাশি বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করে এ দুটি সংস্থা। এজন্য কীটনাশকের ওপরই বেশি নির্ভরতা তাদের। গত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দুই সিটি করপোরেশনের মোট বরাদ্দের ৯০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে কেবল কীটনাশক ক্রয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োগ মূলত তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম। এর আগের গুরুত্বপূর্ণ আরো দুটি পর্যায় রয়েছে। এটি হলো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ। এটি বাদ রেখে সিটি করপোরেশন কীটনাশকের প্রতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কীটনাশক-নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে নথিপত্রে পাওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। দুই সিটি করপোরেশনের গত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্প্রে বা ফগার মেশিন বাদে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বরাদ্দের ৯০ শতাংশই ব্যয় হয়েছে কীটনাশক ক্রয়ে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ৪১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি ২৫৪ কোটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি ১৫৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। দুই সিটি করপোরেশনের মোট বরাদ্দের প্রায় ৩০০ কোটি টাকায় ব্যয় হয়েছে কীটনাশক ক্রয়ে।
বিগত পাঁচ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১৫৩ কোটি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার কীটনাশক কিনেছে। চলতি অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ৮৫ কোটি টাকা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এবারো বরাদ্দের ৯০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে কীটনাশক ক্রয়ে। পরিকল্পনা মতে, এ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ৪৫ কোটি এবং ঢাকা দক্ষিণ ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার কীটনাশক কিনবে।
দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতি বছরই বাড়ছে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ব্যয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঢাকা উত্তরের মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। একইভাবে পাঁচ বছর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ ছিল ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছরে ছিল ৩৫ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণে মশক ব্যয়ে বরাদ্দ অনেক কম করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটিতে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। মূলত গত বছরের কিছু ওষুধ মজুদ থাকায় এ বছর মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ কম দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণের কর্মকর্তারা।
বছরে বছরে ব্যয় বাড়িয়েও মশক নিয়ন্ত্রণের সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। প্রতি বছরই ভয়াবহ আকার ধারণ করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ নানা মশাবাহিত রোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যয় বাড়ালেও সমন্বিত কার্যক্রম অনুসরণ না করায় মশার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না নগরবাসী। তাছাড়া অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বলেও জানিয়েছেন তারা।
মশা মারার জন্য ওষুধ ছিটানোর পদ্ধতি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সাবেক গবেষক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. মাহবুব সিদ্দিকী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অনবরত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মশার দেহে কীটনাশক সহনক্ষমতা বেড়ে যায়। প্রতিটি প্রাণীদেহেই প্রকৃতিগতভাবে এমন সহনক্ষমতা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মশার দেহে কীটনাশকের সহনক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কীটনাশক ছিটালেও একটা সময় পর মশা আর মরে না। তাছাড়া একেক স্থানের মশার জন্য একেক ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন সব জায়গায় একই ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করে। মশার উপদ্রব বাড়ার এটিও একটি কারণ।
মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশকের প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ার বদলে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঢাকার দুই নগর যে পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করছে এ পদ্ধতিতে কখনই মশা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। মশা বেড়ে গেলে নগরের লোকজন ওষুধ ছিটিয়ে মশা মেরে ফেলে। অথচ ওষুধ না ছিটালেও একদিন বা দুদিনের মাথায় স্বাভাবিকভাবেই মশাগুলো মরে যাবে।
তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথমত চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশে মশা বেশি জন্মে। এটি হচ্ছে এক নম্বর ও প্রধান কাজ। দ্বিতীয়ত, জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে কোথায় কোথায় মশা বেশি, কোন ধরনের মশার উপদ্রব বেশি এবং এ মশার জন্য কোন ওষুধ কতটুকু ছিটাতে হবে তা নির্ণয় করে ওই জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যেন এসব জায়গায় নতুন করে মশা জন্মাতে না পারে। এছাড়া মশার অতিরিক্ত প্রজনন বন্ধ করার জন্য জলাশয়ে মাছ, হাঁস ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাসায়নিক ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ চারটিকে একত্রে আমরা সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা বলি।
এরই মধ্যে দুই সিটিতেই সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রয়োগ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, কীটনাশকের মাধ্যমে মশা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাকৃতিকভাবেও মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এরই মধ্যে আমরা খালগুলো পরিষ্কার করে ফেলেছি। জলাশয় পরিষ্কারের ফলে এখন পর্যন্ত মশক আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। আশা করছি, আগামী বর্ষায় ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কম থাকবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন। এক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে খাল পরিষ্কার করা হচ্ছে। আগে ধানমন্ডি খালে প্রচুর আবর্জনা থাকত। কিন্তু এখন সেখানে পরিষ্কার পানি ও মাছ দেখা যাচ্ছে।










