নাগরিক জীবনের শত ব্যস্ততা ভুলে গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবার-পরিজন নিয়ে অমর একুশে বইমেলায় এসেছিলেন বইপ্রেমীরা। তাতে যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল পুরো মেলা প্রাঙ্গণ। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাপিয়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে রাজধানীর শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, নীলক্ষেত, টিএসসি ও পলাশীসহ পুরো এলাকা। ছুটির দিনে সাধারণত বইমেলায় লোকসমাগম বেশিই থাকে। তবে মেলার শুরুর দিকের ছুটির দিনগুলোয় পাঠকের তুলনায় দর্শনার্থী ছিল বেশি। গতকালের পাঠকেরা খালি হাতে না ফেরায় বেড়েছে বিক্রি। ফলে ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীরা।
বেচাবিক্রির কথা বলতেই ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির রেখা ফুটে ওঠে কথা প্রকাশের বিক্রয়কর্মী সাজিদুল ইসলামের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রথম দুই সপ্তাহের ছুটির দিনে ক্রেতারা শুধু বইয়ের ক্যাটালগ নিতেন কিন্তু বই কিনতেন না। ক্যাটালগ দেখে বই বাছাই করে এখন অনেকেই এসেছেন বই কিনতে।’
বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখে কবি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আগের চেয়ে পাঠকসংখ্যা অনেক বেড়েছে। বেড়েছে প্রকাশকের সংখ্যা। জাতি হিসেবে আমরা আরো বেশি জ্ঞান অন্বেষী হয়ে উঠছি, যা আশার কথা।’
তবে বইয়ের দাম নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে পাঠকদের মধ্যে। মাহবুব মেনন নামে একজন ক্রেতা জানান, পাতা সংখ্যা, কাগজের মান ও প্রচ্ছদ অনুযায়ী বইয়ের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বই বিক্রির ওপর। অনেকেই আছেন, যারা দামের কথা বিবেচনায় তিনটির জায়গায় দুটি বা দুটির জায়গায় একটি বই কিনবেন।
এদিকে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় বইয়ের দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা। গোল্ড বুকের ফেরদৌস আহমেদ সম্পা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাগজের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যার কারণে বাধ্য হয়ে বইয়ের দাম বাড়াতে হয়েছে। কাগজের দাম বাড়ার প্রভাব প্রকাশকদের নিট মুনাফার ওপরও পড়ছে।’
ছুটির দিন উপলক্ষে এদিন বেলা ১১টায় শিশু কর্নারে শিশুপ্রহর দিয়ে মেলা শুরু হয়, চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। গতকাল ১৭তম দিনের মেলা শেষ হয় রাত ৯টায়। শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় জনপ্রিয় শিশুতোষ ধারাবাহিক ‘সিসিমপুর শো’। অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় চরিত্র হালুম, সিকু আর টুকটুকিদের সঙ্গে নেচেগেয়ে সময় কাটিয়েছে শিশুরা। পরে মা-বাবার হাত ধরে এ-দোকান ও-দোকান ঘুরে বই সংগ্রহ করতে দেখা যায় শিশুদের। দোকানিরা জানান, শিশুদের পছন্দের বইয়ের তালিকায় রয়েছে অংকন, বাংলা ও ইংরেজির ছোটগল্প। অনেকে থ্রিলার কিংবা ভূতের গল্পের বইও কিনছেন।
তবে বইমেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাঠক ও বিক্রেতারা। এ প্রতিবেদকের সামনেই এক ব্যাংকারের টাকার ব্যাগ চুরি হয়ে যায়। পরে উপস্থিত সবার তত্পরতায় চোর তা ফেলে পালিয়ে যায়। জিনিয়া সুলতানা সিলভি নামের ওই নারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিবারই মেলায় আসি। কিন্তু এ রকম ঘটনা কখনো ঘটেনি। অমর একুশে মেলার মতো জায়গায় এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত। এখানে পকেটমার, চোর ঢোকে কীভাবে? নিশ্চয়ই নিরাপত্তকর্মীদের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
বইমেলায় পাঠক-ক্রেতার পাশাপাশি বেড়েছে ধুলোবালি। নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় ধুলোময় হয়ে পড়ে মেলা। আবদুল্লাহ্ আল ইমরান নামে এক পাঠক জানান, মেলার আশপাশের এলাকায় ধুলোর কারণে শ্বাসকষ্ট হয়। শিশু ও বয়স্কদের খুবই সমস্যা হয়। তাই পানি ঢালা জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্টরা এদিকে নজর দেবেন।
গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছিল ২৭৬টি। সকালে বইমেলার মূল মঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এদিন বিকাল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অনিরুদ্ধ কাহালি ও মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আকরম হোসেন।










