দেশে যে সিলিন্ডারগুলোয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি হয়, সেগুলো তৈরিতে ব্যবহূত হয় উন্নত মানের ইস্পাত বা স্টিল। এগুলোর বাজারমূল্য অনেক বেশি হলেও বাজারজাতের পরিমাণ বাড়াতে গ্রাহকের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারপ্রতি ভর্তুকি দেয় অপারেটররা। এর মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য থাকে গ্রাহকের হাতে সাশ্রয়ী দামে ও সাধ্যের মধ্যে এলপি গ্যাস পৌঁছে দেয়ার। তবে সম্প্রতি একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বাজার থেকে খালি সিলিন্ডার অল্প দামে কিনে তা বেশি দামে বিক্রি করছেন বিভিন্ন স্টিল রি-রোলিং মিলগুলোয়। বিশ্বজুড়ে স্টিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবসা তাদের কাছে লাভজনক। অন্যদিকে বাজারে তৈরি হচ্ছে সিলিন্ডার সংকট। পাশাপাশি সিলিন্ডার স্ক্র্যাপ করার সময় বা কাটার সময় ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনাও।
এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এভাবে বাজার থেকে সিলিন্ডার বিক্রির প্রক্রিয়াটি একেবারেই অবৈধ। এ ধারা চলতে থাকলে এলপিজি খাত হুমকিতে পড়বে। বাজারে সিলিন্ডার না থাকলে গ্রাহক সঠিক সময়ে পণ্য পাবেন না। এ খাতের ব্যবসায়ীদের বড় বিনিয়োগ থাকে সিলিন্ডারে। দীর্ঘদিন ব্যবসা করে সেই মুনাফা তুলে আনেন ব্যবসায়ীরা। সেই চড়া দামের সিলিন্ডার যদি এভাবে বিক্রি বা স্ক্র্যাপে পরিণত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে লোকসানে পড়বেন তারা।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, সিলিন্ডার নির্মাণে ভালো মানের স্টিল ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে স্টিল শিল্পের বাজার চড়া। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সিলিন্ডার স্ক্র্যাপ করে বিভিন্ন স্টিল ফ্যাক্টরির কাছে বিক্রি করছেন। এটি ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। কারণ এলপিজি সিলিন্ডার স্ক্র্যাপ করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী সেটি প্রথমে ডিগ্যাসিফিকেশন করতে হয়। তা না করে যদি এটা কাটা কিংবা ভাঙা হয়, তাহলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হতে পারে। তাই এ ধরনের কাজ যেন কেউ করতে না পারে, সেজন্য লোয়াবের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। সেখানে এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
যেহেতু এলপিজি পরিবহনে সিলিন্ডার অবশ্যই প্রয়োজন হয়, তাই এর দামের সিংহভাগই ভর্তুকি দেন ব্যবসায়ীরা। সাধারণত একটি সিলিন্ডারের দাম শুরু হয় ২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে। কিন্তু ভর্তুকি দেয়ার পর পরিবেশক পর্যায়ে একটি খালি সিলিন্ডারের দাম ধরা হয় ৬০০-৭০০ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকের কাছ থেকে ফেরত আসা খালি সিলিন্ডার রিফিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে পাঠাতে হয় পরিবেশকদের। তবে সম্প্রতি দেখা গেছে, খালি সিলিন্ডার ফেরত যাওয়ার পরিমাণ কমেছে। সিলিন্ডার স্ক্র্যাপ করার কিছু খবরও আসতে থাকে ব্যবসায়ীদের কাছে।
এরই মধ্যে গত মাসে কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডের সফিউল আলম স্টিল মিলসের সামনে থেকে বেশ কয়েকটি কোম্পানির ৪ হাজার ৩২৪টি সিলিন্ডার এবং এর কাটা অংশ জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় একটি মামলাও করে লোয়াব। মামলার বিবরণে বলা হয়, আনুমানিক ৫৬ হাজার ২১০ কেজি ওজনের এসব সিলিন্ডারের দাম ৪৩ লাখ টাকার বেশি। মোট সাতটি ট্রাকে করে এগুলো ওই স্টিল মিলে আনা হয়েছিল। খবর পেয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মালপত্রসহ ট্রাকগুলো জব্দ করে।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে স্টিলের দাম এখন বেশ চড়া। দেশেও চাহিদা অনুযায়ী স্টিলের বাজার বড় হচ্ছে। ফলে স্টিল খাতে ব্যবসা করার নানা সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। যেহেতু এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে দামি স্টিল ব্যবহার করা হয়, তাই বাজারেও চাহিদা অনেক। এক্ষেত্রে বিক্রির জন্য পুরনো ও রঙচটা সিলিন্ডারগুলোকেই মূলত লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। বাজার ঘুরে এ ধরনের সিলিন্ডার সংগ্রহ করে তা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে কিছু স্টিল রি-রোলিং মিলের কাছে।
কিন্তু সিলিন্ডার বিধিমালা-১৯৯১-এ স্পষ্ট লেখা আছে, কোনো অবস্থায়ই সিলিন্ডার স্ক্র্যাপ, কাটা কিংবা আঘাত করা যাবে না। সিলিন্ডার নষ্ট হয়ে গেলে সেটি কাটতে বা ভাঙতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তা করতে হবে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, এলপিজি অপারেটর ও গ্যাস-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে একটি সিলিন্ডার ১০ বছর পরপর পরীক্ষা করাতে হবে। সে সময় সেটির নির্দিষ্ট মান বজায় থাকলে এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেই তা আবারো ব্যবহার করা যাবে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সিলিন্ডার ভাঙা, গলিয়ে ফেলা, এমনকি সিলিন্ডারের গায়ে আঘাত করার বিষয়েও বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব কোনোভাবেই করা যাবে না। যদি সেটি করতে হয়, তাহলে বিস্ফোরক পরিদপ্তর কর্তৃক ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষিত সিলিন্ডারগুলো স্ক্র্যাপ করা যেতে পারে। অন্যথায় এটি হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে অবৈধভাবে কোনো নিয়ম না মেনে ডিগ্যাসিফিকেশন না করে সিলিন্ডার স্ক্যাপ করা হলে সেটি মারাত্মক দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। কেবল স্টিলের উচ্চমূল্যের সুযোগ নিয়ে বাজার থেকে সিলিন্ডার সরিয়ে নিলে তা বাজারেও এক ধরনের প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফলে এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টিতে নজরদারির পরামর্শ দেন এলপিজি খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা।
লোয়াবের তথ্যমতে, দেশের বাজারে ২৭টি অপারেটরের সাড়ে তিন কোটি সিলিন্ডার রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশক, খুচরা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির রিফুয়েলিং স্টেশনে এসব সিলিন্ডার রয়েছে। তবে ঠিক কতটি সিলিন্ডার আবার কোম্পানিগুলোর কাছে রিফিলের জন্য ফিরে যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।










