দেশে গত ১৭ বছরে মানুষের হাতে ৯০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন ও বাংলাদেশ বন বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, এর মধ্যে ২০২০ সালেই হত্যা করা হয়েছে ১১টি হাতিকে। মূলত সবজি ও ধানক্ষেতের চারপাশে বসানো গোপন বৈদ্যুতিক তার থেকেই বেশির ভাগ হাতির মৃত্যু হচ্ছে। এক্ষেত্রে আলাদা জেনারেটর বসিয়ে এসব তারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালনি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেয়া এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি এভাবে হাতি মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে কমিটি।
এর আগে কমিটির বৈঠকে হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য সরেজমিন অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি এ ধরনের অনৈতিক ও বেআইনি কাজে জনগণকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির গতকালের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হাতি হত্যার এসব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বন কেটে হাতির বিচরণ ক্ষেত্র দখল করে স্থানীয়রা সবজি ও ধান চাষ করেন। সেই ফসল যেন হাতি নষ্ট করতে না পারে সেজন্য ক্ষেতের চারপাশে জিআই তারের বেড়া দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। যেহেতু এসব ক্ষেত হাতির চলাচলের পথেই পড়ে, তাই গোপনে পেতে রাখা এসব তারে স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় তাদের।
গত বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিদ্যুতায়িত হয়ে একটি বন্য হাতির মৃত্যু হয়। বনবিভাগের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো স্থাপনা না থাকলেও হাতিটি বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য কোনো জায়গা থেকে বিদ্যুতায়িত হয়ে হাতিটি সেখানে এসে মারা যেতে পারে। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, হাতির মৃত্যুর ঘটনাস্থলের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বৈদ্যুতিক লাইন নেই। কাছেই মথুরাডেংগার কিছু লোক ধান রক্ষার জন্য জেনারেটর স্থাপন করেছিল। তাতেই হাতিটির মৃত্যু হতে পারে।
প্রায় একই সময়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় একটি হাতি হত্যার ঘটনায় গঠিত পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাতি থেকে ফসল রক্ষার জন্য জিআই তার দিয়ে তিন কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ পাতা হয়। সেই ফাঁদে পড়ে হাতিটির মৃত্যু হয়। বৈদ্যুতিক ফাঁদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য যারা ফাঁদ তৈরি করেছিলেন তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
চারটি হাতি হত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করে সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব স্থানে হাতির বিচরণ ক্ষেত্রে রয়েছে, সেসব এলাকা থেকে বৈদ্যুতিক তারের লাইন অনেকটাই দূরে। তাই বৈদুতিক তারে হাতির বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণের ঘটনা খুবই কম অথবা নেই বললেই চলে। শেরপুর ও চট্টগ্রামের হাতির বিচরণক্ষেত্রগুলোতে দেখা গেছে, বন কেটে সাফ করে বিচরণক্ষেত্র দখল করে সবজি চাষ করছে স্থানীয়রা। হাতির চলাচলের কারণে যেন সবজির ক্ষেত নষ্ট না হয় সেজন্য তারা ক্ষেতের চারপাশে জিআই তারের বেড়া দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তারগুলো এতই সূক্ষ্ম যে কারো পক্ষে এক হাত দূর থেকে দেখাও সম্ভব না। আর সেই জেনারেটর থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতের তারে জড়িয়েই মারা যাচ্ছে হাতি।
হাতি হত্যার বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও দীর্ঘ আলোচনা
হয়। কমিটির সদস্যরা বলেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি হাতি রক্ষার জন্য বা অবৈধভাবে বিদ্যুতায়নের বিষয়টি বোঝাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
এ সময় কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খান বলেন, ইলেকট্রিফায়েড করে হাতি হত্যা বেআইনি। কেবল আইলে বিদ্যুতায়নের কারণে হাতি মারা যাচ্ছে তা নয়। অন্য কারণও রয়েছে, সেগুলোও খুঁজে বের করতে হবে। তাছাড়া এভাবে হাতি হত্যা করা হলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।
একই বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, অবৈধভাবে কেউ বিদ্যুতায়ন করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত।










