প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘একটি পলাতক দল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এটাকে (দেশটাকে) আনসেটেল (অস্থিতিশীল) করার জন্য’। বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংস্কার ও নির্বাচন, ছাত্র নেতৃত্বের নতুন দল গঠনসহ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। কথা বলেছেন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতির প্রশ্নেও।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভালো না থেকে উপায় নেই। তবে মাঝখানে কিছু কিছু দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, আমি বলেছি মেঘ দেখা দিয়েছে। এই মেঘগুলো এসেছে অপপ্রচার থেকে। সেখান থেকে আমরা উত্তরণের চেষ্টা করছি।

গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার গঠনের পর প্রথম চেষ্টা ছিল সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে আসল চেহারাটা বের করে আনা। মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করা। তারপর আস্তে আস্তে ভবিষ্যতটা কী হবে, সেটার জন্য চিন্তা করা, কোনদিকে আমরা অগ্রসর হবো। প্রথম চিন্তা এলো, একটা সংস্কার দরকার। যে কারণে এসব ঘটনা ঘটেছে, ফ্যাসিবাদী সরকার ১৬ বছর ধরে চলতে পেরেছে, আমরা কিছুই করতে পারি নাই। তিন-তিনটা নির্বাচন হয়ে গেলো, ভোটারের কোনো দেখা নাই। এই যে অসংখ্য রকমের দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা, মিসরুল ইত্যাদি সেখান থেকে আমরা কীভাবে টেনে বের করে আনবো। এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো করতে হবে’।

দেশের যে ধ্বংসাবশেষ থেকে এসেছিলাম, তার নতুন চেহারা আসছে— উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমরা অর্থনীতি সহজ করেছি। দেশ-বিদেশের আস্থা অর্জন করেছি। তারা বলছে, আমরা অতীতে যা করি নাই তারচেয়ে বেশি করবো এখন’।

দেশ পরিচালনার ছয় মাসে সরকার অনেক কিছুই করেছে, আবার অনেক কিছু ভালো হয়নি বলে মনে করেন ড. ইউনূস। তিনি জানান, ‘কোনোটাই ভালো হয়নি সে অর্থে। যত ইচ্ছা আমাদের –আমাদের ইচ্ছাতো অনেক। রাতারাতি দেশ পরিবর্তন করতে চাই। সেটাতো আমরা পারি নাই। সময় লাগবে।

আমরা চেয়েছিলাম এখনই আমরা সংলাপটা শুরু করবো, এটাও পারি নাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো সময় মতো করতে চেয়েছি, ওই সময়ে করতে পারিনি। অনেকগুলো সংস্কার কমিশন করেছি। ৯০ দিনের মধ্যে কমিশনের রিপোর্ট দেয়ার কথা। তারা দিতে পারে নাই। আরেকটু সময় চেয়েছে- এক মাস, দুই মাস। ওইটুকু একটু পিছিয়ে গেছে’।

দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তার মতে, অপরাধের পরিমাণ মোটেই বাড়েনি। আগের মতোই রয়েছে। তাহলে কেন তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না এমন প্রশ্নে সরকারপ্রধান বলেন, ‘প্রথম দিকে সমস্যা ছিল, পুলিশ বাহিনী যাকে দিয়ে আমরা কাজ করাচ্ছিলাম, তারা ভয়ে রাস্তায় নামছিল না। দুইদিন আগে তারা মানুষকে গুলি করেছে। কাজেই মানুষ দেখলেই সে ভয় পায়। তাকে ঠিক করতে করতেই আমাদের কয়েক মাস চলে গেছে। এখন মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে। এখন আবার নিয়মশৃঙ্খলার দিকে আমরা রওনা হয়েছি’।

সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক এখনও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের মতো রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। সবাই সমর্থন করছে, সবাই চাচ্ছে যে সুন্দরভাবে দেশ চলুক, তাদের মধ্যে ঐক্য আছে। আর রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। কিন্তু তার মানে এই না, ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরেছে। এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি’।

অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এমন মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওনার মনে সন্দেহ হয়েছে কিনা এটা হলো কথা।... আমরা যখন বসি, কেউতো বলে নাই, সন্দেহ হচ্ছে। সে বলছে, আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। সম্পর্কের কোনো ঘাটতি হয়নি’।

রাজনৈতিক দল গঠনে ছাত্রদের সহায়তা করেছে সরকার— কয়েকটি রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপির এমন অভিযোগের বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘সরকার কোনো সহায়তা করে না। যিনি রাজনীতি করতে মন স্থির করেছেন, তিনি ইস্তফা দিয়ে সরকার থেকে চলে গেছেন। উনি প্রাইভেট সিটিজেনশিপে রাজনীতি করবেন, কার বাধা দেওয়ার কী আছে’?

সম্প্রতি দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সবাইকে এক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘যদি নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, দেশ ও জাতির সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে’।

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা তো সবসময় থাকে। একটা পলাতক দল দেশ ছেড়ে চলে গেছে বা তাদের নেতৃত্ব চলে গেছে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এটাকে আনসেটেল করার জন্য। এটাতো সবসময় থ্রেট আছেই। প্রতি ক্ষণেই আছে, প্রতি জায়গাতেই আছে’।

বছরের শেষে নির্বাচন হলে এর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ইস্যুতে তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমরা একেবারে প্রত্যেকটা সুপারিশ দেবো। এর সঙ্গে কথা থাকবে, আপনার রাজনৈতিক দল এটা কি সমর্থন করে? এটাতে রাজী আছেন? রাজী থাকলে বলেন, না থাকলেও বলেন। বা যদি কোনো একটা সংশোধনী এনে রাজী হবেন, সেটাও বলেন। এটা কি নির্বাচনের আগে সংশোধন করা ঠিক হবে নাকি নির্বাচনের পরে— সব প্রশ্নের এখানেই সমাবেশ আছে। তাদের শুধু বলতে হবে কোনটা। সবকিছু মিলালে আমরা এটা ঠিক করবো কোন সুপারিশে সবাই একমত হয়েছে। সেটা আলাদা করব। এটাকে আমরা বলবো একটা চার্টার- জুলাই চার্টার। সেই ঐকমত্যই আমরা গঠন করার চেষ্টা করছি’।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনে আসা-না আসা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই যে ঐকমত্য। আমরা (সরকার) বরাবরই ফিরে যাচ্ছি ঐকমত্যে। সবাই মিলে যা ঠিক করবে আমরা তাই করবো। আমার বরাবরই পজিশন হলো, আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। আমাদের এই দেশের ওপরে সমান অধিকার। আমরা সব ভাই ভাই। আমাদেরকে এই দেশেই বাঁচতে হবে। এ দেশকেই বড় করতে হবে। কাজেই যে মত-দল করবে, তার মতো করে, সবকিছু করবে। এই দেশ থেকে কারও অধিকার কেড়ে নেয়ার কোনো উপায় নাই। কিন্তু যে অন্যায় করেছে, যার বিচার হওয়া উচিৎ, তার বিচার হতে হবে। এটুকুই শুধু’।

এর আগে এক-এগারোর সময় রাজনৈতিক দল গঠনের কথা বলেছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। পরে অবশ্য রাজনীতিতে জড়াবেন না বলে ঘোষণাও দেন। তবে বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে রয়েছেন। এ নিয়ে মূল্যায়ন জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি বলেছি যে পলিটিক্স ইজ নট মাই কাপ অফ টি, ওটা ওখানেই সমাপ্ত, এরপর আমাকে রাজনীতির কাছে কেউ টানতে পারেনি। সবাই চেষ্টা করেছে দেশের নেতৃত্ব নেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী হন। সবাই চেষ্টা করেছে। আমি ওটা চাই নাই। আমি বলেছি, ওই চ্যাপ্টার শেষ। আমিতো এই পদে (প্রধান উপদেষ্টা) আসতেও চাই নাই। আমাকে অনুরোধ করেছে, বহুবারই করেছে। তারপর আমি শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়েছি, দায়িত্ব নিয়েছি। রাজনৈতিক পদ যদি হয়ে থাকে, এটা বাই ডেফিনেশন। আমি রাজনীতি করি না’।