প্রতি বছর অবকাঠামো উন্নয়নের খরচ এবং পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে ঘোষণা করা হয় সিটি করপোরেশনের বাজেট। যার অধিকাংশই মেটায় সরকার। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে নিজস্ব আয় বাড়াতে সিটি করপোরেশনগুলোকে বারবার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোর বাজেট এবং নিজস্ব আয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যয়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ আয় করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
দ্রুত ও মানসম্মত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশে বর্তমানে সিটি করপোরেশনের সংখ্যা ১২। এসব সিটি করপোরেশনের মধ্যে নিজস্ব আয়ে এগিয়ে আছে কুমিল্লা ও রংপুর। এছাড়া রাজশাহী ও ময়মনসিংহ নিজস্ব আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
গড়ে প্রতিটি সিটি করপোরেশনের ৪০টির মতো আয়ের খাত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স ফি থেকে। যে সিটি করপোরেশন এ দুটো খাতে তদারক বেশি করবে, ওই সিটি করপোরেশনের আয় তত বেশি হবে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের বাজেট এবং নিজস্ব আয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যয়ের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আয় করে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত অর্থবছরে ১ হাজার ৭৭৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বাজেটের বিপরীতে আয় করে ৭০৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা আনুপাতিক হারে ৩৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ঢাকা দক্ষিণের তুলনায় কম আয় উত্তর সিটি করপোরেশনের। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২ হাজার ৮৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা বাজেটের বিপরীতে আয় করেছে ৭১১ কোটি টাকা, যা আনুপাতিক হারে ২৫ শতাংশ।
আয়ের দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। সংস্থাটি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করে। এর বিপরীতে বিভিন্ন খাত থেকে ৪০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আয় করে, যা আনুপাতিক হারে ৮২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এর পরই বেশি আয় করেছে রংপুর সিটি করপোরেশন। গত অর্থবছরে ৭৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাজেট ঘোষণা করে ৫৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় করে সংস্থাটি। বাজেটের তুলনায় আয়ের পরিমাণ ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে এমন সিটি করপোরেশন দুটি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট থেকে উন্নয়ন ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে এ পরিসংখ্যান আরো কমে আসবে।
নিজস্ব আয়ের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে রাজশাহীর অবস্থান শীর্ষে। সংস্থাটি গত অর্থবছরে ৯৯৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বাজেটের বিপরীতে আয় করে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। আনুপাতিক হারে মাত্র ১ শতাংশ। এদিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। গত অর্থবছরে ৪৯৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বাজেটের বিপরীতে সংস্থাটি ৪৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আয় করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সিটি করপোরেশনগুলোকে নিজস্ব আয়ে চলার নির্দেশ দেয়ার পরও নিজস্ব আয় বাড়াতে পারছে না বেশির ভাগ সিটি করপোরেশন। আয় বৃদ্ধিতে নানা জটিলতা কাজ করে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সদিচ্ছা থাকলে নিজস্ব আয়ে চলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কর্মকর্তারা।
সিটি করপোরেশনের আয় কম হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ মামলা জটিলতা উল্লেখ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় কম হওয়ার পেছনে মামলা জটিলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখা যায়, যে সম্পত্তি ভাড়ায় খাটিয়ে সিটি করপোরেশন আয় করবে, সেটির মালিকানা নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা মামলা করে রেখেছে। ফলে সিটি করপোরেশন আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের সিটিতেও বেশকিছু সম্পত্তি আটকে ছিল। আমরা সেগুলো আইনিভাবে নিষ্পত্তি করেছি। এতে চলতি অর্থবছরে আমাদের নিজস্ব আয় ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আশা করি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশনের বাজেটে অনেক বিষয় দেয়া থাকে। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় বেশি ধরা হয়। সে বিবেচনায় নিজস্ব আয় হিসাব করলে কম হবেই। আমরা নিজস্ব আয় বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স ফি অনলাইনে নিচ্ছি। বকেয়া কর আদায়ের ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছি। এভাবে আমরা ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
সরকারের পক্ষ থেকে নিজস্ব আয়ে চলার নির্দেশনা অনুসরণ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতিটি সিটি করপোরেশন যেন নিজস্ব আয়ে চলতে পারে সে নির্দেশনা সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দেয়া হচ্ছে। সে লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মার্কেট, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাজার ভাড়া দিয়ে নিজস্ব আয় বাড়াচ্ছে সিটি করপোরেশনের খালি জায়গায় আমরা নতুন নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেও আমাদের আয় বাড়াচ্ছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আশা করছি দ্রুতই আমরা স্বনির্ভর হয়ে উঠব।










