নব্বইয়ের দশকের আগে দেশে সিমেন্ট কারখানা ছিল মাত্র দুটি। সেই সময় আমদানির মাধ্যমে সিমেন্টের চাহিদা মেটানো হতো। নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সিমেন্ট খাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। একে একে গড়ে উঠতে থাকে অনেক কারখানা। সরকারের অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর চাহিদা বিবেচনায় গত এক যুগে সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়িয়েছেন অনেক। তবে কাঁচামালের ঊর্ধ্বমুখী দাম, জাহাজীকরণ ব্যয় ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হারে উল্লম্ফনের মতো বিষয়গুলো এ খাতের ব্যবসায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা দিন দিন খাতটির জন্য বোঝা হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩৪টি সিমেন্ট কোম্পানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কোম্পানির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮ কোটি ৫০ লাখ টন। এর মধ্যে ব্যবহূত হচ্ছে ৪ কোটি টন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতাই অব্যবহূত থাকছে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে সিমেন্ট খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে তিন গুণের মতো। মূলত সরকারের অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করেই এ খাতের উদ্যোক্তারা নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সিমেন্ট জোগানের মাধ্যমে এ খাতের কোম্পানিগুলোর ভালো ব্যবসা হয়েছে। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ২১ জেলার মধ্যে যে সংযোগ তৈরি হবে তার প্রভাবে সিমেন্টের চাহিদা বাড়ার প্রক্ষেপণ ছিল তাদের। তাছাড়া পদ্মা সেতুর সঙ্গে মোংলা ও পায়রা বন্দরের মাধ্যমে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রত্যাশিত গতিও সিমেন্টের ব্যবহার বাড়িয়ে তুলবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু স্থানীয় ও বৈশ্বিক বেশকিছু কারণে সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তাদের এ প্রত্যাশা হোঁচট খেয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের সিমেন্ট খাত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিএমএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, মেগা প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সিমেন্টের ব্যবহার কিছুটা কমেছে। কিন্তু একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের সক্ষমতা কমে গিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি কমেছে, শিল্পে বিনিয়োগ কমে গিয়েছে, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গিয়েছে। এসব কারণেও সিমেন্টের ব্যবহার কমেছে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়ার বহুবিধ প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে লাইটার ভেসেল করে সিমেন্ট নিয়ে আসতে খরচ বেড়েছে। সারা দেশে পণ্য পৌঁছে দিতে ব্যয় বেড়েছে, ভারত থেকে যে ফ্লাই অ্যাশ আসে সেখানেও ব্যয় বেড়েছে। সব খাতে এত ব্যয় বেড়েছে যে সবাই বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে পণ্যের দাম সেভাবে বাড়ানো যায়নি। এ খাতে সক্ষমতা অনেক বেশি কিন্তু এর তুলনায় ভোগের পরিমাণ কম। বর্তমানে এ খাতের কোম্পানিগুলো চলতি মূলধন সংকটে পড়েছে। পাশাপাশি ডলারের ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে এলসি খুলতে দেরি হওয়ায় কাঁচামালের সংকটেও পড়তে হয়েছে। গত বছর সিমেন্ট খাতে ৩৬-৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও এ বছরের আট মাসে ১ শতাংশের মতো ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই বিক্রি কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে সিমেন্ট খাতে এত বড় বিপর্যয় আর কখনো দেখা যায়নি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক মাস ধরেই সিমেন্ট খাতের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারসহ অন্যান্য কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা সিমেন্ট খাতকে আরো চাপে ফেলে দিয়েছে। এমনিতেই কভিড সংক্রমণ পরিস্থিতির প্রভাবে জাহাজীকরণের ব্যয় অনেক বেড়ে গিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এটি আরো বেড়েছে। ক্লিংকার উৎপাদনে ব্যবহূত কয়লার দামও এ সময়ে বেশ বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন পণ্যটির দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ক্লিংকার রফতানিকারক দেশগুলো নিজেদের জন্য মজুদ রেখে পরবর্তী সময়ে অন্যদের কাছে বিক্রি করছে। এতে সিমেন্ট উৎপাদনে অত্যাবশ্যকীয় এ কাঁচামালের সংকটও তৈরি হয়েছে। এদিকে ডলারের বিনিময় মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কাঁচামাল আমদানি ও মূল্য পরিশোধের সময়ের ব্যবধানে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোর। সর্বশেষ দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ব্যয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়লেও সিমেন্টের দাম সেভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েক দফা দাম বাড়ানো হলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। মূলত সিমেন্ট খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহজে একক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তাছাড়া বাজার ধরে রাখতে প্রতিযোগী কোম্পানির চেয়ে পণ্যের দাম কম রাখার মতো কৌশল তো রয়েছেই।

ক্রাউন সিমেন্টের উপদেষ্টা মাসুদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, গত ছয় মাসে সিমেন্ট খাতে ২ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বড় কোম্পানিগুলোরই অতিরিক্ত সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। ডলারের বিনিময় মূল্যের কারণে এ খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। ক্লিংকারসহ সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জাহাজীকরণের ব্যয়ও বেড়েছে।  ২ শতাংশ অগ্রিম আয়করের কারণেও সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্যও কোম্পানিগুলোর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সবদিক দিয়েই সিমেন্ট খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। আগামীতে হয়তো সিমেন্ট খাতে আবারো প্রবৃদ্ধি হবে। তবে চ্যালেঞ্জগুলো সামনেও থাকবে। ফলে বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বেশি থাকার কারণে তারা টিকে যাবে। কিন্তু ছোট কোম্পানিগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। কাঁচামালের দাম, জ্বালানির দাম ও জাহাজীকরণের দাম সামনে হয়তো কিছুটা কমে আসবে। এরই মধ্যে কাঁচামালের দাম কিছু কমেছে। তবে সরকার যদি অগ্রিম আয়করের বিষয়টি বহাল রাখে তাহলে সিমেন্ট কোম্পানির জন্য মুনাফা করাটা কঠিন হয়ে যাবে।

এ বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের আয় কমে গিয়েছে ৩ শতাংশ। লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের আয় বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশের মতো। তালিকাভুক্ত স্থানীয় সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত সময়ের আর্থিক হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে এ বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক ব্যবসায়িকভাবে ভালো যায়নি দেশের পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর। বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে এ সময়ে কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা কমে গিয়েছে। অন্যদিকে কারো কারো মুনাফার পাশাপাশি আয়ও কমেছে।

প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, কাঁচামালের দামের অস্থিরতা, জাহাজীকরণ ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও অগ্রিম আয়করের মতো বিষয়গুলো সিমেন্ট খাতের ব্যবসাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বছরে তিন মাস সিমেন্টের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। বাকি নয় মাস সবার অর্ধেক সক্ষমতা অলস বসে থাকছে। অথচ কোম্পানিগুলো ব্যাংকঋণ নিয়ে কারখানায় বিনিয়োগ করেছে। সক্ষমতা কাজে না লাগলেও ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। রডের দামের ওপরও সিমেন্টের ব্যবহার নির্ভর করে। সম্প্রতি রডের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে গিয়েছে। এতে সিমেন্টের বিক্রিও কমেছে। রেমিট্যান্সের ওপরও সিমেন্ট খাতের ব্যবসা নির্ভর করে। তবে আশার কথা হলো বাংলাদেশে মাথাপিছু সিমেন্টের ব্যবহার এখনো অনেক কম রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে কোম্পানিগুলোর বাড়তি সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে, যা কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সম্প্রতি সরকার নয়টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে সিমেন্টও রয়েছে। এরই মধ্যে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। সিমেন্টের দাম বেঁধে দেয়ার বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ দাম বেঁধে দেয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক বলছেন। এর পেছনে যুক্তি হচ্ছে অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে সিমেন্ট খাতে প্রতিযোগিতা বেশ তীব্র। এ কারণে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সিমেন্টের দাম বাড়ানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে কোম্পানিগুলোর ন্যূনতম মুনাফার দিকটি নিশ্চিত করে মূল্য বেঁধে দেয়া হলে সেটি ভালোই হবে। অন্যদিকে কেউ কেউ এ ধরনের দাম বেঁধে দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, একেক কোম্পানির কারখানা একেক জায়গায় অবস্থিত। ফলে উৎপাদিত পণ্য দেশের সব স্থানে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে যে ব্যয় হয় সেটি কোম্পানিভেদে ভিন্ন। এক্ষেত্রে সিমেন্টের সার্বজনীন মূল্য নির্ধারণ কীভাবে করা সম্ভব হবে সেটি নিয়ে তারা সন্দিহান।