সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, অসুস্থ রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এতে কার্যত ভেঙে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনমান।

সরজমিনে জানা যায়, উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ডা. আজাহার উদ্দিন সড়কের পূর্বপাশে চর উমেদ গ্রামে প্রায় দুই যুগ আগে বেতুয়া খালের ওপর ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ও তিন মিটার প্রস্থের এ আয়রন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। এতে উপজেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয় ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজি, চতলা, পাটোয়ারী বাজার ও কাজীরবাজারসহ আশপাশের দুর্গম গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। গত ২৩ জুন দুপুরে একটি বালিভর্তি ট্রাক ব্রিজটি পেরিয়ে চরমোল্লাজি গ্রামের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে ব্রিজটি ভেঙে খালে পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা ট্রাকচালক নাঈম এবং গুরুতর আহত হন হেলপার আলামিন। আর এতেই কয়েক গ্রামের মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেখানকার বাসিন্দাদের ভরসা একটি ডিঙি নৌকা। সেখানেও রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাঁচ বছর ধরেই সেতুটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানো হয়নি এবং বাসিন্দাদের সচেতনও করেনি উপজেলা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। এলজিইডির গাফিলতিতেই ঘটেছে এত বড় দুর্ঘটনা।

রমাগঞ্জের বাসিন্দা মো. কবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্রিজটি ছিল বেতুয়া খালের দুই পাড়ের মানুষের মিলনস্থল। সেটি এখন বিচ্ছিন্ন। এটি দিয়ে দুই পাড়ের মানুষ সহজে চলাচল করত। সেতুটি ভেঙে যাওয়ার কারণে এক কিলোমিটারের পথ যেতে ঘুরতে হয় পাঁচ কিলোমিটার। চরমোল্লাজি গ্রামসহ নদীর ওই পাড়ে অধিকাংশই কাঁচা সড়ক। একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারবে না। আসলে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই।’

সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় বর্তমানে আমাদের চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাত নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে জানান আরো দুই স্থানীয় বাসিন্দা মো. মফিজ ও নুরুল ইসলাম। তারা বলেন, ‘সেতুটা না থাকায় খালের ওই পাড়ে (ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজি গ্রাম) ব্যবসার মালাপত্র ও কৃষিকাজের জন্য পাওয়ার টিলার নিতে পারছি না। এখন জনপ্রতি ৫ টাকা করে ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা দিয়ে কোনোমতে পারাপার করছি। যখন জরুরি মুহূর্তে নৌকাও পাব না, তখন কী হবে? এছাড়া দৈনিক কয়েকবার নৌকা দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।’

পূর্ব চরমোল্লাজি স্কুলের শিক্ষার্থী মো. ফাহিম ও আরাফাত বলে, ‘আগে আমরা নিরাপদে সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। বর্তমানে সেতুটি ভেঙে যাওয়ার কারণে নৌকা দিয়ে খাল পার হতে হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. কবির ও আরাফাত হোসেন বলেন, ‘সেতুটি পাঁচ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু সেতুটি যে ঝুঁকিপূর্ণ, সে রকম কোনো সাইনবোর্ড এলজিইডি এখানে টানায়নি এবং ভারী যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়নি। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দিলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

ব্রিজটি ভারী ট্রাক চলাচলের উপযোগী ছিল না বলে স্বীকার করলেন লালমোহন উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানজিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনাটির কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, আয়রন ব্রিজের পোস্টগুলোর পানির নিচের অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ট্রাকের ঝাঁকুনি নিতে পারেনি। ব্রিজ সংস্কারের জন্য এরই মধ্যে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপি হচ্ছে এবং তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছি। দ্রুত ব্রিজটি সংস্কার করে বাসিন্দাদের চলাচলের উপযোগী করার জন্য কাজ করছি।’