শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই নাব্য সংকটে স্থবির হয়েছে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের একমাত্র নৌবন্দর বাঘাবাড়ী। পাবনার বেড়া উপজেলার কাজীরহাটের প্রায় তিন কিলোমিটার ভাটিতে পেঁচাকোলা ও নাকালিয়া চরে নাব্য সংকটে বাঘাবাড়ী বন্দরমুখী পণ্যবাহী কার্গোজাহাজ পদ্মা-যমুনার ডুবোচরে আটকা পড়েছে। দিন দিন ডুবোচরে আটকে পড়া জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা জ্বালানি তেল, সার, কয়লা, পাট উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু নাব্য সংকটের কারণে স্থবির হতে বসেছে শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী নৌবন্দর। স্বাভাবিক অবস্থায় এ বন্দরে প্রতিদিন ১২-১৫টি পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়লেও দুই সপ্তাহ ধরে দু-তিনটি করে জাহাজ ভিড়ছে। এ অবস্থায় বন্দরের অধিকাংশ শ্রমিকই বেকার হয়ে পড়েছেন।
নৌবন্দর সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার বেশির ভাগ তেল ও সার এ বন্দরের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া সিমেন্টের ক্লিংকার, কয়লা, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে এ বন্দরে এসে জাহাজ ভেড়ে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকেই বন্দরে অচলাবস্থা শুরু হয়। একপর্যায়ে নৌবন্দরে কর্মরত ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় সবাই বেকার হয়ে পড়েন। পরে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হলেও শ্রমিকদের বড় একটি অংশ বেকারই থেকে যান। তারা ভেবেছিলেন, বোরো মৌসুম সামনে রেখে নৌবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। কিন্তু তা না হয়ে উল্টো প্রায় স্থবির হতে বসেছে।
বন্দরে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, বছরের এ সময়েই সবচেয়ে বেশি জাহাজ নৌবন্দরে ভেড়ার কথা। অথচ নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়ায় প্রতিদিন দু-তিনটির বেশি জাহাজ ভিড়তে পারছে না। যে জাহাজগুলো ভিড়ছে, সেগুলোকে ৪০-৫০ কিলোমিটার দূরে প্রায় অর্ধেক পণ্য ছোট নৌযানে খালাস করে ভিড়তে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঠিকাদাররা পণ্য পরিবহনে নগরবাড়ী ঘাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌঘাট বেছে নিচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী বাঘাবাড়ী নৌবন্দরটিতে জাহাজের সংখ্যা দিন দিন কমছে।
নৌবন্দরে সার নিয়ে আসা এমভি কাশেম-২ জাহাজের মাস্টার জসিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম থেকে আট হাজার বস্তা সার নিয়ে এসেছিলাম। নাব্য সংকটের কারণে তিনদিন দৌলতদিয়ায় নোঙর ফেলে অবস্থান করতে হয়েছে। এরপর ছোট নৌযানে চার হাজার বস্তা সার খালাস করে জাহাজের ওজন হালকা করার পর বন্দরে আসতে পেরেছি।
জাহাজের চালক জানান, পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো আরিচা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে আসতে পারছে। কিন্তু এর পর বেড়া উপজেলার ব্যাটারিরচর, পেঁচাকোলা, নতিবপুর, নাকালিয়া ও মোহনগঞ্জে এসে আর সামনে যাওয়া যাচ্ছে না। এসব স্থানে যমুনা নদীর গভীরতা ৭-৮ ফুটে নেমে এসেছে। অথচ পণ্যবোঝাই জাহাজ চলাচলের জন্য কমপক্ষে ১০ ফুট গভীরতার প্রয়োজন। তাই জাহাজগুলোকে দৌলতদিয়ায় নোঙর ফেলে ট্রলারসহ বিভিন্ন ছোট নৌযানে আংশিক পণ্য খালাস করে তারপর নৌবন্দরে আসতে হচ্ছে।
শ্রমিকরা জানান, আগে একদিন কাজ করে ৬০০-৭০০ টাকা রোজগার হতো। এখন দিনে ৩০০-৩৫০ টাকার মতো হচ্ছে। তার পরও সব দিন কাজ থাকে না।
বন্দরের শ্রমিক সরদার আবদুল মজিদ বলেন, কম জাহাজ ভেড়ায় নৌবন্দরের ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৫০০ শ্রমিকই বেকার থাকছেন। যারা কাজ করছেন, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় অর্ধেক মজুরি পাচ্ছেন। এ অবস্থায় চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে শ্রমিকদের।
গত বুধবার সরেজমিন বন্দর ঘুরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও মোংলা বন্দর থেকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা এমভি আছিয়া খালেক গাজী, মেসার্স করিম শিপিং লাইনস, ওটি শিপার্স ওয়ানন্ড-২, ওটি করিম-৬, এমটি সুলতানা, ওটি আছিয়া বেগম, এমভি সুমাইয়া হোসেন, এমভি ফয়সাল, এমভি ফয়সাল, এমভি ফয়সাল-৮সহ ১২টি জাহাজ পেঁচাকোলা, চরশিবালয় ও নাকালিয়া চরে বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা ও যমুনার ডুবোচরে আটকা পড়েছে। কার্গো জাহাজগুলো রাসায়নিক সার, কয়লা, গম ও চাল নিয়ে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে যাচ্ছিল।
এমভি আছিয়া খালেক গাজীর মাস্টার মো. সোহেল রানা জানান, দৌলতদিয়া থেকে বাঘাবাড়ী নৌবন্দর পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার নৌপথের ছয়টি পয়েন্টে পানির গভীরতা কমে দাঁড়িয়েছে ৭-৯ ফুট। সরু হয়ে গেছে নৌ চ্যানেল। এ পয়েন্টে দুটি জাহাজ পাশাপাশি চলাচল করতে পারছে না। ওই পয়েন্টে জেগে ওঠা চরের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন চ্যানেলটি আরো সরু হচ্ছে।
নৌবন্দরের ইজারাদার আবদুস সালাম বলেন, নাব্য সংকটে বড় জাহাজ বন্দরে আসতে পারছে না। ছোট নৌযানে অর্ধেক পণ্য খালাস করে বন্দরে ভিড়তে হচ্ছে। এজন্য প্রতি বস্তায় ১৮ টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এ অবস্থায় এ বন্দর দিয়ে পণ্য না এনে নগরবাড়ী, খুলনাসহ অন্য এলাকা দিয়ে পণ্য আনতে শুরু করেছেন ঠিকাদাররা। ফলে বাঘাবাড়ী বন্দরটি স্থবির হতে বসেছে।
বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক ও বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের বন্দর কর্মকর্তা সাজ্জাদ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বাঘাবাড়ী নৌবন্দর দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। তাই ৭ ফুটের বেশি ড্রাফট বা গভীরতা নিয়ে কোনো জাহাজ আসার কথা নয়। কিন্তু বেশির ভাগ জাহাজই ১০-১২ ফুট ড্রাফট নিয়ে বন্দরে আসছে। ফলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে নৌপথ সচল রাখতে এ নৌপথের বাঘাবাড়ী থেকে আরিচা পর্যন্ত অংশে তিনটি ড্রেজারে খননকাজ চলছে।










