পদ্মা সেতুর সুফল পেতে নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে সড়ক অবকাঠামো। বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে নড়াইল-ভাঙ্গা ও কালনাঘাট পর্যন্ত গড়ে তোলা হবে নতুন ১৩০ কিলোমিটার ছয় লেন সড়ক। এজন্য নেয়া হয়েছে নতুন প্রকল্প। ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা। এর বাজেট পাস হলে নিয়োগ হবে প্রকল্প পরিচালক। আপাতত ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর-নড়াইল সড়ক প্রশস্ত করা হবে।

আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতু। ঢাকার সঙ্গে সহজ যাতায়াত প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাড়বে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ। গতি পাবে নগরায়ণ। এর সুবিধাভোগী হবে যশোর জেলার মানুষও। তবে পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরো অপেক্ষা করতে হবে যশোরের মানুষকে। প্রতিদিন ৩০০ ট্রাক আমদানীকৃত পণ্য নিয়ে বেনাপোল বন্দর ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্যবাহী গাড়িগুলো যশোর-নড়াইল সড়ক ব্যবহার করবে। অথচ সড়কটির অতিরিক্ত ওজন-সহনীয় ক্ষমতা নেই। যে কারণে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে নড়াইল-ভাঙ্গা ও কালনাঘাট পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নিতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা শেষে একটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর বেনাপোল হয়ে যশোর-নড়াইল সড়কে বেশি ওজনের গাড়ির চলাচল বাড়বে। কিন্তু সড়কের সেই ধারণক্ষমতা নেই। যে কারণে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আমরা একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এতে রয়েছে বেনাপোল থেকে যশোর হয়ে নড়াইল, ভাঙ্গা-কালনাঘাট পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার ছয় লেন সড়ক নির্মাণ। সড়কে যেসব কালভার্ট-সেতু রয়েছে সেগুলো ভেঙে বিআইডব্লিউটিএর নকশায় নির্মাণ করা হবে। সড়কটির নির্মাণশেষ হতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লেগে যেতে পারে। তখন বৃহত্তর যশোরের মানুষ পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ভোগ করবে। আপাতত ৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ দিয়ে যশোর-নড়াইল সড়ক প্রশস্ত করা হবে। ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি ২৪ ফুটে  উন্নীত করা হবে। চলতি বর্ষা মৌসুম শেষে এ সড়কের কাজ শুরু হবে।

এদিকে বাসমালিকরা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি পদ্মা সেতু দিয়ে তারা গাড়ি ছাড়বেন কিনা। কেননা, যশোর থেকে যেসব পরিবহন ছেড়ে যায় সেখানে মাগুরা জেলার যাত্রীরাও ওঠেন। আবার সড়কটি ২৪ ঘণ্টা পরিবহন চলাচলের উপযোগী নয়।

যশোরের ঈগল পরিবহনের স্বত্বাধিকারী পবিত্র কাপুড়িয়া জানান, যশোর-নড়াইল সড়কে বেশি লোড ক্যাপাসিটি নেই, অপ্রশস্ত। যে কারণে এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি, পদ্মা সেতু চালু হলে কোন পথ ব্যবহার করব। আবার আমাদের পরিবহনগুলোর যাত্রীরা প্রায় মাগুরা জেলার। তাছাড়া নড়াইলের কালনা সেতু এখনো চালু হয়নি। নতুন অবকাঠামো গড়ে না উঠলে যশোরের মানুষ পদ্মা সেতুর সুফল পাবে না।

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ পুরো বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এজন্য অবশ্যই নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

জেলায় উৎপাদন হওয়া সবজি, মাছ ও ফুল সহজে পৌঁছবে রাজধানী ঢাকায়। দাম বেশি পাবেন চাষীরা। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুর রহিম জানান, যশোরের গদখালিতে বছরে ৪০০ কোটি টাকার ফুল বেচাকেনা হয়। যশোর থেকে গাড়িতে ফুল পাঠালে ঘাটে বসে থাকতে হয় অনেকক্ষণ। এতে ফুলের সজিবতা থাকে না, যে কারণে দাম কম পেতাম। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি গেলে সময় আড়াই ঘণ্টা বাঁচবে। তখন সহজেই আমাদের ফুল ঢাকার বাজারে যেতে পারবে। ফুল টাটকা থাকলে দামও বেশি মিলবে।

বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিইবি) সাবেক সভাপতি এমআর খায়রুল উমাম বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে সুফল পেতে গেলে আমাদের কয়েক বছর সময় অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, যে সড়কটি ব্যবহার হবে সেটি হলো বেনাপোল হয়ে যশোর-নড়াইল সড়ক। সড়কটির অতিরিক্ত ধারণ ক্ষমতা নেই। এজন্য নতুনভাবে নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, জেলাটি যাতে পদ্মা সেতুর সুফল ভোগ করতে পারে সেজন্য সবকিছু করা হবে। এরই মধ্যে সড়ক অবকাঠামো উন্নত করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ৬ লেন সড়কটি বাস্তবায়ন হলে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাবে সব শ্রেণি পেশার মানুষ।