জুন মাসে কালুরঘাট সেতুতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ সেতু দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সেতু সংস্কারের কারণে আগামী তিন মাস দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকবে। চলতি মাসে দ্বিগুণ জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) কর্তৃপক্ষ। তবে স্বল্প সময়ে নেয়া এ উদ্যোগের পরও আগামী কয়েক মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বিউবো। আঞ্চলিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাবে চট্টগ্রামে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত প্রতিদিন ফার্নেস অয়েলবাহী ট্রেন চলাচল করে। একটি ট্রিপে ৮/১৬ লোডিং পজিশনের ট্রেনে ২০০ টন করে ফার্নেস অয়েল পরিবহন করে রেলওয়ে। এ তেল দিয়ে কেন্দ্রটির দৈনিক জ্বালানি চাহিদার অর্ধেক পূরণ হয়। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে মজুদ ফার্নেস অয়েল দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখে কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রেলওয়ের ফুয়েল আনলোডিং প্লাটফর্ম শিফটিংয়ের সংস্কারকাজের জন্য মাসজুড়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ রাখে রেলওয়ে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিজস্ব মজুদ ফুরিয়ে আসায় আগামী কয়েক মাস বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নিয়ে সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে বিউবো।
এদিকে কালুরঘাট সেতু সংস্কারের কাজ শুরু হচ্ছে জুনে। এ কারণে বাড়তি ট্রিপের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল মজুদের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ৯ মে থেকে প্রতিদিন একটি ট্রিপের পরিবর্তে দুই ট্রিপে দোহাজারীতে জ্বালানি পরিবহন চলছে। সেতু বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন দুটি করে ট্রিপ অব্যাহত রাখবে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময়ের মধ্যে পরবর্তী তিন মাসের মোট জ্বালানি চাহিদার সমপরিমাণ ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করা না গেলে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ, কালুরঘাট সেতু সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সেতু বন্ধ রাখার বিষয়টি সময় নিয়ে বিউবোকে জানানো হয়নি। আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করা হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিজস্ব ১০ হাজার টনের রিজার্ভারে ফার্নেস অয়েল মজুদ করার সুযোগ থাকত। এখন দৈনিক দুটি ট্রিপের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করে যতটুকু সম্ভব মজুদের চেষ্টা চলছে। জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সড়ক কিংবা নৌপথে জ্বালানি সংগ্রহের বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। তবে এতে সময় ও পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
সর্বশেষ গত ৮ মে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে দোহাজারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ সংকটকালে ও সেচকাজে চাহিদা বেশি থাকায় দোহাজারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন চালু রাখা জরুরি। হঠাৎ করে কালুরঘাট সেতু বন্ধ হয়ে গেলে দোহাজারী-কালিয়াইশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না। তাছাড়া ফেব্রুয়ারিতে রেলওয়ের সংস্কারকাজের জন্য এক মাস জ্বালানি পরিবহন বন্ধ থাকার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ মজুদও শেষ পর্যায়ে। দৈনিক ট্রিপ সংখ্যা বাড়ানো না হলে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া বিকল্প নেই বলেও চিঠিতে তিনি দাবি করেন।
দোহাজারী-কালিয়াইশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি মাসে গড়ে ২৫-৩০টি ফার্নেস অয়েল ওয়াগন ট্রিপ পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে ২৯টি ট্রিপ পরিচালনা করা হয়েছিল, জানুয়ারিতে ৩৪টি, মার্চে ২৫টি ও এপ্রিলে ২৮টি। বিউবো থেকে চিঠি পাওয়ার পর ৯ মে থেকে ট্রিপ সংখ্যা দ্বিগুণ করায় ২১ মে পর্যন্ত ওয়াগনে জ্বালানি পরিবহন করা হয়েছে ২৭টি। যদিও মে মাসের শুরুতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুরোধে জ্বালানি তেল পরিবহন তিন দিন বন্ধ রাখা হয়।
বিউবো কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশে গ্যাস, কয়লা সংকটের কারণে ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। চলমান তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত উৎপাদন না হওয়ায় সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। এ কারণে চট্টগ্রামের দোহাজারী ১০০ ও হাটহাজারী ১০০ ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। ওদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানিস্বল্পতার কারণে ২৩০ মেগাওয়াটের পরিবর্তে দৈনিক (১২ ঘণ্টা) মাত্র ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যে কারণে সার্বিক চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে দোহাজারী পিকিং বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা জরুরি বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ উন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। বিভিন্ন জটিলতার কারণে রেলওয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কালুরঘাট পুরনো সেতুর পরিবর্তে নতুন সেতু নির্মাণ করতে পারেনি। এ কারণে পুরনো সেতুটি সংস্কারের মাধ্যমে সেপ্টেম্বর থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হবে। জুন থেকে পুরনো কালুরঘাট সেতু সংস্কারের কাজ শুরু হলে ট্রেনের পাশাপাশি সব ধরনের যানবাহন বন্ধ থাকবে। আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা বাড়তি ট্রিপের বিষয়ে চিঠি দেয়ার পর আমরা প্রতিদিন দুটি ট্রিপে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি পরিবহন করছি।’
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রিপে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত প্রতি ওয়াগনে ভাড়া দিতে হয় ১২ হাজার ৫২৫ টাকা। এ হিসাবে প্রতি ট্রিপে রেলওয়ের আয় হয় ১ লাখ ২০০ টাকা। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক আরো একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াটের এ কেন্দ্রেও রেলওয়ে ফার্নেস অয়েল পরিবহন করে। আগামী কয়েক মাস দোহাজারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলেও হাটহাজারীতে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।
দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কালুরঘাট সেতু সংস্কার শুরু হলে আমাদের জ্বালানি পরিবহন সংকটে পড়বে। পিক সিজন হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো ছাড়া উপায়ও নেই। লোডশেডিংয়ে যাতে না পড়তে হয় এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আমরা প্রতিদিন এক ট্রিপের পরিবর্তে দুই ট্রিপে ৪০০ টন ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করছি। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের সর্বোচ্চ পরিমাণ ফার্নেস অয়েল সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। মজুদ শেষ হয়ে গেলে বিকল্প কোনো উপায়ে চট্টগ্রাম থেকে ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করা যায় কিনা সে বিষয়ে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।’










