সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় সিলেটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতের। ধান, বীজতলা ও সবজিসহ সব ধরনের ফসল হারিয়েছেন কৃষক। ধীরগতিতে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার কারণে বেড়েছে তাদের ক্ষতির পরিমাণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ফসল হারিয়ে ৪০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষীরা। এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে প্রণোদনা চান তারা। তবে কৃষি বিভাগের আশ্বাস, তাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বন্যায় পাকা বোরো ধান ডুবেছে ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর, আউশ বীজতলা ডুবেছে ১ হাজার ৩০১ হেক্টর ও সবজি ডুবেছে ১ হাজার ৪ হেক্টর। বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়ায় বোরো ধান কৃষকের গোলায় তোলা সম্ভব হয়নি। আউশ ও গ্রীষ্মকালীন সবজি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া পেয়ারা, কলাবাগানসহ অন্যান্য ফলের বাগান তলিয়ে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। বন্যার পানি কমলেও বীজতলা নষ্ট হওয়ায় এবার আর আউশ ধানও ঘরে তুলতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ফলে বছরজুড়ে খালি থাকবে আউশের মাঠ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ১১-২২ মে পর্যন্ত সিলেটে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। ভারতের আসাম ও মেঘালয় উপত্যকায় টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকাসহ ১০টি উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সীমান্ত নদী সুরমা, কুশিয়ারা, সারী, ধলাই, গোয়াইন, পিয়াইন উপচে পানি প্রবেশ করে হাওর ও লোকালয়ে। এতে তিন-চার ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। ডুবে যায় আবাদ করা পাকা বোরো ধান, আউশের বীজতলা আর গ্রীষ্মকালীন সবজির মাঠ। ধীরগতিতে পানি কমায় কৃষক ধান ও সবজি ঘরে তুলতে পারেননি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলা ইউনিয়নের উমাইরগাঁওয়ে কৃষকরা পানির নিচ থেকে পচা বোরো ধান কাটছেন। আব্দুল করিম নামে এক কৃষক বলেন, বন্যার পানি নেমে যেতে বিলম্ব হওয়ায় ধান তোলার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। জমিতে এসে দেখি এখনো ধান ঝরে পড়েনি। ফলে পচন ধরে গেলেও কিছু ধান সংগ্রহের চেষ্টা করছি।
রফিকুল ইসলাম নামে আরেকজন কৃষক বলেন, অন্যের জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। বন্যা এসে সব নিয়ে যাবে কল্পনাও করিনি। এখন নিজে খাওয়ার ধান দূরে থাক, জমির খাজনা কীভাবে দেব, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সরকার সহায়তা না দিলে আবার চাষাবাদ শুরু করাই অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার।
বিশ্বনাথ উপজেলার তালিবপুরের কৃষক লায়েক আহমদ নোমান ১০ একরের বেশি জায়গায় কলাবাগান করেছিলেন। বন্যায় পুরো বাগান তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, বিপুল অংকের লোকসান মাথায় নিয়ে ফের আবাদ সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি সহায়তা চান তিনি।
কানাইঘাটের বাসিন্দা শওকত আলী বলেন, গ্রীষ্মকালীন সবজির মাঠ নষ্ট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষীরা। বন্যাপরবর্তী ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি প্রণোদনা না পেলে বিকল্প সবজি চাষের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে প্রণোদনা দাবি করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সম্পাদক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দ্রুত বন্যাপরবর্তী সংকট মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। প্রণোদনা যাতে প্রকৃত কৃষক পান, সেদিকে দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেটের উপপরিচালক কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, এবারের বন্যায় কৃষকের মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার সব ধরনের সহায়তা করবে কৃষকদের। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির ধরন ও পরিমাণ চিহ্নিত করে সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকদের বীজ বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান।










