পাবনার নগরবাড়ী ঘাট একসময় উত্তরবঙ্গের একমাত্র প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ছিল। ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা জটিলতায় নগরবাড়ী নৌবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। অথচ এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল তিন বছরের। দীর্ঘ পাঁচ বছরে মাত্র ৬০ শতাংশ কাজ হওয়ায় নতুন করে আরো দুই বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর ফলে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ছে। এদিকে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এ বন্দরে বড় জাহাজ নিয়ে এসে পণ্য খালাস অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ চলতে থাকায় এখানে আমদানি পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশের উত্তরাঞ্চলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়াতে সরকার পাবনার নগরবাড়ীতে একটি আধুনিক নদীবন্দর নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৮ সালে ৫১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনার পাড়ে কর্মযজ্ঞ শুরু করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্প শুরুতেই ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতাসহ নানা জটিলতায় পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্ধারিত মেয়াদেও কাজ শেষ না করতে পারায় প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর এবং ব্যয় বাড়ানোরও আবেদন করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ।
পাবনার নগরবাড়ী নৌবন্দর কর্মকর্তা মো. ওয়াকিল জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত নদীবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এরই মধ্যে নদীপারের বিভিন্ন স্থাপনার কাজ শেষ হয়েছে। তবে জেটি নির্মাণের কাজ এখনো বাকি। তিনি বলেন, ‘পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাড়ীতে একসঙ্গে ১০টি জাহাজ পণ্য খালাস করতে পারবে। এখানে অটোমেশন সুবিধা থাকবে। ফলে পণ্য খালাসে গতি বাড়বে।’
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যমুনা নদীপারে বিশাল এলাকাজুড়ে ইট-বালি, রডসহ নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দেশ ট্রেডিংয়ের প্রতিনিধি রাজিব হোসেন জানান, নগরবাড়ী বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলায় সার, কয়লা, পাথর ও অন্যান্য আমদানি পণ্য সরবরাহ করা অনেক সহজ। নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এ বন্দরে বড় জাহাজ নিয়ে এসে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিজেদের জাহাজে করে নগরবাড়ী ঘাটে সরাসরি পণ্য নিয়ে আসা যায়। এখান থেকে তা সড়ক পথে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় সহজেই পরিবহন করা যায়। বর্তমানে আমদানি পণ্যের একটি বড় অংশ দক্ষিণের জেলাগুলোয় খালাস করা হচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলে সড়ক পথে পরিবহনে সময়ের সঙ্গে খরচও বাড়ছে ট্রাকপ্রতি ৮-১০ হাজার টাকা।
নগরবাড়ী ঘাট এলাকার আমদানিকারক যশোরের নওয়াপাড়া গ্রুপের স্থানীয় প্রতিনিধি আরমান হোসেন বলেন, ‘আমাদের আমদানি করা সার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের জন্য নগরবাড়ী ঘাটে নিয়ে আসা হয়। এখানে নির্মাণকাজ চলমান থাকায় এবং নদীতে পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় এখন বেশির ভাগ পণ্য যশোরের নওয়াপাড়া ঘাটে আনলোড করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় এ বন্দরে বড় জাহাজ নিয়ে এসে পণ্য খালাস অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
নগরবাড়ী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রফিক উল্লাহ জানান, আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বন্দরে প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো। ৮-১০টি জাহাজ পণ্য নিয়ে আসত। কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করত এখানে। কিন্তু বর্তমানে ঘাটে জাহাজ ভিড়তে না পারায় আমদানি-রফতানি কমে গেছে। ফলে শত শত শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি দ্রুততম সময়ে নৌবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ করার দাবি জানান।
এ ব্যাপারে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজিম উদ্দিন পাঠান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে কাজে ধীরগতি আর প্রকল্প এলাকায় দীর্ঘমেয়াদে বর্ষার পানি জমে থাকায় সময়মতো কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে আবারো প্রকল্পের সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান বাজারের সঙ্গে মিল রেখে প্রকল্পের ব্যয় পুনর্নির্ধারণে কারিগরি কমিটি কাজ করছে।’










