বিভিন্ন পিলারের অবকাঠামোগত স্থায়িত্ব বাড়ানো এবং যাত্রী চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেফটি অডিট কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ১০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেফটি অডিট কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির ষষ্ঠ পর্যালোচনা সভায় এসব কাজের অগ্রগতি ও নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, মেট্রোরেলের ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিলারে মোট ১০টি স্টিল ব্র্যাকেট স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৮ নম্বর পিলারে নতুন বিয়ারিং প্যাডও স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ডিএমটিসিএলের মজুদে থাকা পাঁচটি বিয়ারিং প্যাড দ্রুত বিভিন্ন পিলারে স্থাপনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আরো ২২টি বিয়ারিং প্যাড সংগ্রহে ক্রয়প্রক্রিয়া চলছে।
জানা গেছে, মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের পিলারে সূক্ষ্ম অবস্থান পরিবর্তন ও ফাটল নিয়মিত পর্যবেক্ষণে নতুন কারিগরি ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২৭টি পিলারের পিয়ার হেডে সেটলমেন্ট মার্কার ও ক্র্যাক গেজ স্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচটি সেটলমেন্ট মার্কার ও দুটি ক্র্যাক গেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়াও চলছে। পুরো কাঠামোয় মোট ১০২টি ক্র্যাক গেজ স্থাপন করে ফাটল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পিলারের পিয়ার হেড ও বক্স গার্ডারে থাকা ফাটলের স্থায়ী কারিগরি সমাধান খুঁজতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলেছেন, এর মাধ্যমে কাঠামোগত ত্রুটির কারণ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শুধু অবকাঠামো নয়, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায়ও সংস্কার আনা হচ্ছে। চালক ও প্রকৌশলীদের চিহ্নিত ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের (ওসিএস) স্পার্কিং সমস্যার তদন্ত শেষ হয়েছে। ইনসুলেটেড ওভারল্যাপের (আইওএল) নকশায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি স্টেশন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় ওয়াটারপ্রুফিং ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে স্টেশনগুলোর যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে বিশেষ যোগাযোগসেবা ব্যবস্থার পরীক্ষাও সফল হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাওগাতুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের কারিগরি পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড বদলের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। কয়েকটি বিয়ারিং প্যাড এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। বাকি প্যাডগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দ্রুত সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি বুয়েটকে যুক্ত করা, ফাটল পর্যবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ লাইনের নকশা সংস্কারের কাজও জোরদার করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করাই এসব তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের লক্ষ্য।’
সেতু, উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোয় পিলার ও ওপরের ভায়াডাক্টের সংযোগস্থলে সাধারণত রাবারজাত বিশেষ ধরনের বিয়ারিং প্যাড ব্যবহার করা হয়। কাঠামোর ভার বহনের পাশাপাশি এটি কম্পন শোষণে সহায়তা করে। চলন্ত মেট্রোরেল বা উড়ালসড়ক থেকে এ ধরনের ভারী সরঞ্জাম খসে পড়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিরল হলেও বাংলাদেশে মেট্রোরেল চালুর পর তিন বছরের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে দুবার।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী মেট্রোরেলের এ অংশে ৬২০টি পিলার রয়েছে। এসব পিলারে মোট ২ হাজার ৪৮০টি বিয়ারিং প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। এ ঘটনায় টানা ১১ ঘণ্টা মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ছিল। এরপর গত বছরের অক্টোবরে ফার্মগেট স্টেশনসংলগ্ন ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে আরেকটি বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ে। এতে এক পথচারীর মৃত্যু হয়।
পরপর দুটি ঘটনায় মেট্রোরেলের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় দেশের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের সেফটি অডিট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই বর্তমানে পুরো মেট্রোরেলপথের কাঠামোগত নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে সংস্কারকাজ চালাচ্ছে ডিএমটিসিএল।










