সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সরকারি পর্যায়ে দেশভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে ভারত, চীন ও জাপান। বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনায় এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। কিছুটা এগিয়েছে ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের কার্যক্রম। এখনো তুলনামূলক কম অগ্রগতি চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সূত্র অনুযায়ী, জাপানিজ ও চীনা বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে চাইছে সরকার। এ দুই দেশ থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তরকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত স্থান ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে। আবার চট্টগ্রামে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু টানেলের পাশে গড়ে তোলা হবে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। এছাড়া ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে নির্মিত হচ্ছে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জিটুজি উদ্যোগগুলোর মধ্যে অগ্রগতি সবচেয়ে ভালো জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের। চলতি মাসেই এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছর এ অঞ্চলে অন্তত কিছু শিল্প স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এদিকে ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে এরই মধ্যে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে এখনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি চীনের। সার্বিকভাবে দেশভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দৌড়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছে জাপান।
জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির বাস্তব রূপ পাওয়ার পথপরিক্রমার শুরু ২০১৪ সালে। ওই বছরের মে মাসে দেশটি সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজটি ভিন্ন গতি পায়। জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাইকার মাধ্যমে পরিচালিত হয় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রকল্প অনুমোদন করে।
জাপান সরকার জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের জন্য ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন প্রোজেক্টের আওতায় ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডলার সহায়তা দিয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি স্থাপনে ২০১৯ সালের ২৬ মে বেজা ও জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পের আওতায় এক হাজার একরের মধ্যে ৬২০ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ৩৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এছাড়া জাইকার আরো ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন, গ্যাস পাইপলাইন, বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে।
এদিকে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ পায় ২০১৪ সালের জুনে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকালে চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের শিল্প-কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরে আগ্রহ প্রকাশ করে। এ সময় চীন সরকার তাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে চীন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বেজার মধ্যে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ৭৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) অফসাইট অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীন সরকার ২৮ কোটি ডলারের রেয়াতি ঋণ বা কনসেশনাল ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত জিটুজি অর্থনৈতিক অঞ্চলটির গোড়াপত্তন হয় ২০১৫ সালের জুনে। ওই সময় বেজার আওতায় ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এ ধারাবাহিকতায় মিরসরাই ও বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও পরিচালনা করা হয়েছে। ভারত সরকারের নমনীয় ঋণ বা কনসেশনাল লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হবে।
বেজা এরই মধ্যে মোংলায় ১১০ একর জমির মালিকানা গ্রহণ করেছে। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার ও মিরসরাই অঞ্চলে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ১০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে ভারত সরকার। বাংলাদেশ-ভারত অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের মে মাসে বেজা ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা হয়েছে। এসব সভায় ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। মোংলায় ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার হিসেবে হিরানন্দানি গ্রুপকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া মিরসরাই ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেডকে ডেভেলপার হিসেবে নির্বাচিত করা রয়েছে।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র সচিব ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চলের জিটুজি চুক্তি দুটি। একটা মোংলায়, আরেকটা বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে এরই মধ্যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে। এলওসির অর্থ দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটার অগ্রগতি ভালো। আর মোংলারটার তেমন অগ্রগতি নেই। জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের অগ্রগতি ভালো। চলতি মাসের মধ্যেই সেটির ১৬০ একর জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে। সম্ভাবনাময় বিনিয়োগকারীদের তালিকাও আমরা পেয়েছি। ইউটিলিটি কানেকশন থেকে শুরু করে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। আর চীনের মনোনীত নতুন ডেভেলপার দায়িত্ব নিলে তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলটির কাজ এগিয়ে যাবে ও গতি পাবে। এরই মধ্যে সেখানে ছোট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
বেজা সূত্র জানিয়েছে, ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য এখন পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। এর পরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সাবস্টেশন স্থাপন নিয়ে একটা সমস্যা ছিল, তবে সেটার সমাধান হয়েছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩০ শতাংশ জমি দিয়ে অংশীদারিত্বে রয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এদিকে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার হিসেবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে মনোনীত করেছিল চীন সরকার। তবে সেটির অনুমোদন দেয়নি মন্ত্রিপরিষদ। চীন সরকারকে ডেভেলপার পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ জানানোর প্রক্রিয়া চলছে।
বেজা সূত্রমতে, জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলটির এক হাজার একরের অঞ্চলটিতে অন্তত ১০০টি জাপানি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। জমি উন্নয়নের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ কিছু শিল্পও স্থাপন হয়ে যাবে। চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চলটির জমি অধিগ্রহণ ও বেশকিছু উন্নয়নের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে বেজার বেঁধে দেয়া মানদণ্ডগুলো অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্বাচিত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান আদানি গ্রুপ। তাদের সঙ্গে চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বেজার সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে শিল্পজগতের ডেভেলপার গড়ে ওঠেনি। তাই বেজার অত্যন্ত সৃজনশীল উদ্যোগ হলো জিটুজি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা। সেজন্য আইন সংশোধন করে জিটুজি জোন প্রতিষ্ঠার প্রভিশন তৈরি করা হয়। এরপর আমরা সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি জিটুজি স্থাপনের চুক্তি করি। একটি ভারতের সঙ্গে, অন্য দুটি চীন ও জাপানের সঙ্গে। চীন-ভারত-জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাস্তবায়ন এখন বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। জাপানেরটা অনেক আগে শুরু হয়েছে। বিদেশী ডেভেলপারদের সঙ্গে এ ধরনের কাজগুলোর বাস্তবায়ন কিছুটা সময়সাপেক্ষ।










