প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে গড়ে প্রতি দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান। আর ঢাকায় প্রতি তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়। সড়ক অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই চট্টগ্রামের দুর্ঘটনাগুলো বেশি প্রাণ ঝরাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
যেকোনো দুর্ঘটনাতেই সবার আগে সাড়া দেয় ফায়ার সার্ভিস। গত বছর দেশে মোট ৮ হাজার ৮১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাড়া প্রদান করেছে সংস্থাটি। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের তথ্যমতে, এসব দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১ হাজার ৭৭৩ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ হাজার ৮৭২ জনকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। বিভাগটিতে ১ হাজার ৪২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪৮৬ জন। আনুপাতিক হার বিবেচনায় ঢাকায় গড়ে প্রতি ২ দশমিক ৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান।
দুর্ঘটনার সংখ্যা ঢাকায় বেশি হলেও প্রাণহানিতে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম। বিভাগটিতে গত বছর ৯৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩৬৩ জন। আনুপাতিক হিসাবে গড়ে প্রতি ২ দশমিক ৬২টি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান চট্টগ্রামে। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার পরই রয়েছে বরিশাল। বিভাগটিতে গত বছর ৩৭০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গড়ে প্রতি ৩ দশমিক ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান বারিশালে।
সিলেটে গড়ে প্রতি পাঁচটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান। বিভাগটিতে গত বছর ১৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহে গত এক বছরে ৯৫০টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৮ জন। আনুপাতিক হিসাবে প্রতি ৬ দশমিক ৪১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ময়মনসিংহে মারা যান একজন করে। খুলনায় গড়ে প্রতি ৭ দশমিক ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান একজন করে। বিভাগটিতে গত বছর ১ হাজার ৪৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৩ জন নিহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে কম রাজশাহীতে। বিভাগটিতে গড়ে প্রতি ৮ দশমিক ৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে নিহত হয়েছেন। সেখানে গত বছর সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনা প্রাণহানি ঘটেছে ২৫৪ জনের। বিভাগভিত্তিক দুর্ঘটনার দিক থেকে রাজশাহীর অবস্থান সবার ওপরে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রংপুর। বিভাগটিতে গত বছর ১ হাজার ৩১০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৮ জন। আনুপাতিক হিসাবে গড়ে প্রতি ৭ দশমিক ৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় একজন করে মারা যান রংপুরে।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বণিক বার্তাকে বলেন, বড় সড়ক দুর্ঘটনাগুলোতে ফায়ার সার্ভিস সবার আগে সাড়া প্রদান দেয়। এর বাইরে ছোট ছোট সড়ক দুর্ঘটনায়ও চাহিদার ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সাড়া দেন। সাড়া দেয়া সড়ক দুর্ঘটনার ভিত্তিতেই এ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা কিছু কিছু বিভাগে বেশি হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব বিভাগে সড়কের তুলনায় গাড়ির চাপ বেশি, সেখানেও প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। একই সঙ্গে সড়কের শৃঙ্খলা মানার প্রবণতা কম থাকলেও এমন প্রাণহানির মতো সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। তাই নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোগুলোও সঠিকভাবে দেখভাল করতে হবে। যেসব বিভাগে এমন সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, মুখোমুখি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে। এজন্য সবার আগে সারা দেশের সড়কগুলোতে ডিভাইডার দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান ইকোনমিক করিডোর চট্টগ্রাম। তাই সেখানে যান চলাচলও অনেক বেশি। এজন্য সেখানকার সড়ক দুর্ঘটনাগুলো অতিমাত্রায় প্রাণহানিকর হয়ে উঠেছে। জরুরি ভিত্তিতে প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।










