প্রতিকূল আবহাওয়া এবং টানা বর্ষণের কারণে চলতি মৌসুমে বোরো বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বীজধান কাটা শেষ হলেও টানা বৃষ্টিতে অনেক স্থানের বীজধানের গুণগত মান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে বিপাকে পড়েছে সরকারের ধানবীজ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। গত ১৭ জুনের পর টানা বর্ষণে ধান কাটার সময় অনেক বীজধানের গুণগত মান ঠিক রাখা সম্ভব হয়নি। যার কারণে এ অঞ্চলের অনেক কৃষকের বোরো বীজের মান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিএডিসিকে বীজধান সরবরাহ করতে পারছে না। যার কারণে চলতি বছরে বীজধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সংশয়ে খোদ বিএডিসির কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুই জেলায় ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে বিএডিসি। প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ এক টন ধানবীজ ধরে দুই জেলা থেকে প্রাথমিকভাবে ৯৫০ টন বোরো বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৭০৫ টন এবং কক্সবাজার জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২৪৫ টন। তবে ১৮-২২ জুন পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতের কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কেননা ওই সময়টিই ছিল বীজধান কাটা, শুকানোসহ অন্যান্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টি পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।

চট্টগ্রামের পটিয়ার কৃষক ইব্রাহিম বণিক বার্তাকে জানান, প্রায় ২০ একর জমিতে বোরো বীজধান আবাদ করেছিলেন তিনি। কিছুটা আগে বীজ রোপণ করায় বৃষ্টি শুরুর আগেই তিনি বীজধান কেটে ফেলেছেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বেশির ভাগ কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ এ বছর যে টানা বৃষ্টি হয়েছে তা অন্যান্য বছর দেখা যায়নি। ফলে কৃষক সতর্ক ছিলেন না। যেসব কৃষক বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের প্রণোদনার আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।

কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বোরো ধানবীজ দেরিতে আবাদের কারণে বীজধান সংগ্রহে দেরি হয়। সে কারণে যদি মৌসুমের শুরুতেই বীজধান মাঠে রোপণ করা যায়, তাহলে এ অঞ্চল থেকে ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তবে চলতি মৌসুমে যদি এ অঞ্চলে বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা না যায়, তাহলে উত্তরবঙ্গের বীজ সরবরাহে বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলায় ৫০ হেক্টর জমিতে বিআর ১৬ জাত, ৯০ হেক্টরে ব্রিধান ২৮, ৩৫৫ হেক্টরে ব্রিধান ২৯, ৩০ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ৭৪, ২০ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ৮১ জাত, ৬০ হেক্টরে ব্রিধান ৮৮, ৬০ হেক্টরে ব্রিধান ৮৯ এবং ৪০ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ৯২ জাত আবাদ করা হয়। চট্টগ্রামের ৬১ জন কৃষক এ বোরো জাতের ধানবীজ উৎপাদন করছেন। এ বীজধান কাটার সময় চট্টগ্রামে মোট ৩১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এছাড়া কক্সবাজার জেলার ৪১ জন কৃষক ২৪৫ হেক্টর জমিতে মোট আট জাতের বোরো বীজ উৎপাদনে বিএডিসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। যার মধ্যে বিআর ১৬ জাতের ধানের বীজ চাষ হয় ২০ হেক্টর জমিতে, ১০ হেক্টরে ব্রিধান ২৮, ৪৫ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ২৯, ৭০ হেক্টরে ব্রিধান ৭৪ জাত, ২০ হেক্টরে ব্রিধান ৮১, ১০ হেক্টরে ব্রিধান ৮৮ জাত, ৩০ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ৮৯ জাত এবং ৩০ হেক্টর জমিতে ব্রিধান ৯২ জাতটি আবাদ করা হয়। বীজধান কাটার সময় ১৮-২২ জুন এ জেলায় মোট ২২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ছাড়াও ফেনীতে ৫৯২ হেক্টর এবং নোয়াখালী জেলায় বোরো বীজ আবাদ করা হয়েছে মাত্র ৪৬ হেক্টর জমিতে।

বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুই জেলাসহ ফেনী জেলায় বোরো বীজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বীজতলা থেকে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে বিএডিসি। কিন্তু বোরো বীজ কাটার সময় কিংবা কাটার পরবর্তী সময়ে বীজধান শুকানোর সময় চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ অন্যান্য জেলায় টানা বর্ষণে কৃষকরা বোরো বীজধান শুকাতে পারেননি। বিএডিসি কৃষকদের কাছ থেকে বীজধান কেনার সময় যেসব বিষয় লক্ষ রাখে সেগুলো হলো বীজের আর্দ্রতা ১২ শতাংশ আছে কিনা, বীজধান চকচকে কিনা, ভালো করে শুকানো হয়েছে কিনা কিংবা বীজ দাগমুক্ত কিনা। এসব বিষয় বিবেচনা করেই বীজধান সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সে হিসেবে চলতি বোরো মৌসুমে বীজ সংগ্রহে চট্টগ্রামের দুই জেলায় যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে তা হয়তো পূরণ করা সম্ভব হবে না।

এ প্রসঙ্গে বিএডিসির (কগ্রো) উপপরিচালক মো. আবু সাঈদ হাসান লতিফ বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কয়েকদিন আগে টানা বর্ষণে বোরো বীজধানের প্রক্রিয়াকরণের সময় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ বীজধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বোরো বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে কিনা এসব নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হবে।