নেত্রকোনা সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক প্রায় ১৫ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০১৯ সালে দেশে ফিরে যৌথ খামার তৈরির উদ্যোগ নেন। খামারের নাম দেয়া হয় সৌদি-বাংলা এগ্রো। সঙ্গে ছিলেন ইতালি প্রবাসী রনি সাহা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী নন্দলাল সরকার ও মানিক সাহা। ৪৫টি ছাগল ও ৩৫টি গরু নিয়ে খামার শুরু করেন তারা। তবে খাদ্যের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির কারণে লোকসানে পড়ে খামার ছোট করতে বাধ্য হয়েছেন এ খামারিরা। মাত্র দুই-আড়াই বছরের ব্যবধানে সৌদি-বাংলা এগ্রো খামারের গরু-ছাগলের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬টিতে। আর্থিক দুর্দশায় পড়ে আব্দুর রাজ্জাক আবারো বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পশুখাদ্যের অন্যতম উপাদান গম, ভুট্টা ও সয়াবিন। কভিড-১৯ মহামারীর পর দেশের বাজারে বিভিন্ন খাদ্যশস্যের দাম বাড়তে থাকে। মহামারীর প্রভাব শেষ না হতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে আমদানিনির্ভর গম ও ভুট্টার দামও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় দু-তিন গুণ। এর প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক পশু খামারিদের ওপর। ফলে শুধু আব্দুর রাজ্জাকই নন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের অনেকেই খামার ছোট করছেন, কেউ নিঃস্ব হচ্ছেন আবার কেউ পেশা পরিবর্তন করছেন। খামারসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পশুখাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মহামারীর পর থেকে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন উদ্যোক্তারাও খামার তৈরির বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

দেশে প্রচলিত পশুখাদ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সয়াবিন খৈল, গমের ভুসি, রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, মুগ ভুসি ও মটর ভুসি। বর্তমানে ৫০ কেজির সয়াবিন খৈলের দাম ৩ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম ৬৮ টাকা। গমের ভুসি ৩৫ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৯৮০ টাকা। কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৫৭ টাকা। রাইস পলিশ প্রতি কেজির দাম ৪০ টাকা হিসেবে ৫০ কেজির বস্তার দাম ২ হাজার টাকা। মসুর ভুসি ৩০ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি কেজি ৫০ টাকা। সরিষার খৈল ৬৪ কেজির বস্তার দাম ৩ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি কেজি ৫৫ টাকা। ভুট্টা ভাঙার প্রতি কেজির দাম ৫০ টাকা হিসেবে ৫০ কেজির বস্তার দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা। মুগ ভুসি ৪০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৯৫০ টাকা। সে হিসেবে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৪৯ টাকা। আর মটর ভুসি ১৮ কেজির বস্তার দাম ১ হাজার ৫০ টাকা। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা দরে।

জানা গেছে, গত বছরের মার্চে সয়াবিন খৈল প্রতি কেজি ৬৪ টাকা, গমের ভুসি ৩৯, রাইস পলিশ ২৭, মসুর ভুসি ৩৩, সরিষার খৈল ৪০, ভুট্টা ৩৪, মুগ ভুসি ৩৬ ও মটর ভুসি ৩৪ টাকা ছিল। যদিও ২০১৯ সালে সয়াবিন খৈল ৩৪ টাকা, গমের ভুসি ২১, রাইস পলিশ ১৪, মসুর ভুসি ১৪, সরিষার খৈল ২৫, ভুট্টা ১৬, মুগ ভুসি ১৭ ও মটর ভুসির প্রতি কেজির দাম ছিল ১৯ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে গমের ভুসি, রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, ভুট্টা ভাঙা, মুগ ভুসি ও মটর ভুসির দাম প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। আর সয়াবিন খৈল ও সরিষার খৈলের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

আব্দুর রাজ্জাক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘গরু যে দামে কিনে আনি ছয় মাস-এক বছর খাওয়ানোর পর সে দামে বিক্রি করতেও কষ্ট হয়। একসময় গম, খৈল, ভুসি এগুলো খাইয়েছি। কিন্তু লোকসান হচ্ছে দেখে সেসব খাওয়ানো বন্ধ করে দিয়েছি। ঘাস, খড় ও ধানের গুঁড়া খাওয়াচ্ছি। এ কারণে তাদের প্রডাক্টিভিটিও কমে গেছে।’

ভোলা, নেত্রকোনা, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পশু খামারিদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা সবাই কম-বেশি খামার ছোট করেছেন। কেউ কেউ গুটিয়ে নিয়েছেন। তাদেরই একজন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার রানা মণ্ডল। ২০১৮ সালের শেষ দিকে নিজ উদ্যোগে চারটি ছাগল দিয়ে খামার শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে সে খামার রূপ নেয় ১১টি ছাগল ও চারটি গরুতে। কিন্তু খাদ্যের চড়া মূল্যের কারণে লোকসান গুনতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে ২০২২ সালের মাঝামাঝির দিকে খামার গুটিয়ে নেন। পশু বিক্রির অর্থ দিয়ে উপজেলা শহরে ছোট রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেছেন।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খুব আশা নিয়ে খামার শুরু করেছিলাম। ইচ্ছে ছিল একেবারে দেশী জাত দিয়ে খামার সমৃদ্ধ করব। যখন শুরু করি তখন ২-৩ টাকায় দুই মুঠি ঘাস পাওয়া যেত, যা এখন প্রায় ২৫-৩০ টাকা। গম-ভুসিসহ অন্যান্য খাদ্যের দাম তো দ্বিগুণ। এ কারণে টিকতে না পেরে খামার ছেড়ে দিই। আমার বাড়িতে এখনো মোটর, ঘরসহ সবকিছু সাজানো আছে। কিন্তু পরিবার চালাতে হলে একেবারে পথে বসে গেলে বিপদ। তাই কিছু পুঁজি থাকতেই খামার ছেড়ে দিয়েছি।’

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) তথ্যমতে, সারা দেশে ছোট-বড় ১০ লাখের বেশি ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামার রয়েছে। তবে মহামারীর পর থেকেই খামারিরা লোকসান গুনছেন। ফলে অনেক খামারই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

মহামারীর পর থেকে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিডিএফএর মহাসচিব শাহ ইমরান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাবারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দুধের পর্যাপ্ত দাম না পাওয়ায় খামারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যাদের আছে তারাও অনেকটা গুটিয়ে আনছেন। সঠিক বাজারজাতের অভাবে খামারিরা লোকসান গুনছেন। সরকারের সঙ্গে আমরা বসেছি। কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্সও উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’

বরিশাল বিভাগে মোট ৩ হাজার ১৮৮টি ডেইরি ও ফ্যাটেনিং খামার রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরিশাল ও ভোলা জেলায়। ভোলা জেলায় ৭৬৩টি খামার রয়েছে। গত কয়েক মাসে প্রায় ৬০-৭০টি খামার বন্ধ হয়েছে। বিডিএফের ভোলা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। দুধের দাম পাওয়া যায় না। সরকারিভাবে দুগ্ধ খামারিদের টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নিতে হবে। এখনো পাউডার দুধ আমদানি হয়। অথচ আমাদের দেশে উৎপাদিত দুধ থেকে চাইলে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। স্কুল ফিডিংয়েও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুধ নেয়া হয়। প্রান্তিক খামারিদের কথা এক্ষেত্রে ভাবতে হবে।’

ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা তৌহিদুল ইসলাম আবির বলেন, ‘ডেইরি শিল্পে অনেক শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হয়েছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশ এখন মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু লোকসানে পড়ে অনেকেই খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে বেশিদিন লাগবে না আবার আমদানিনির্ভর হতে। সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে খামারিদের টিকিয়ে রাখার জন্য। কারণ এটা শুধু মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণই করছে না, বরং অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।’

পশুখাদ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়লেও সে অনুপাতে দুধের দাম বাড়েনি। নেত্রকোনা সদর উপজেলার খামারি নাদিম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৯-২০ সালের দিকে বাড়ি থেকে দুধ নিয়ে যেত ৪৫ টাকা করে। যেটা এখন আমরা ৫০ টাকা করে পাই। তারা নিয়ে ৬৫-৭০ টাকা বিক্রি করে। একটি বড় সাইজের গরুর খাবারের জন্য মাসে প্রায় ৫-৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সে অনুপাতে আয় হয় না।’

দিনাজপুর শহরের কালীতলা মহল্লার শেখ নাসিম আলী ৩৫ বছর ধরে ডেইরি ব্যবসা করেন। ২২টি গাভী থেকে দৈনিক ১৬ হাজার টাকার বেশি দুধ বিক্রি করেন। মাসে বিক্রি করেন প্রায় ৫ লাখ টাকার দুধ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চারজন কর্মচারীকে মাসে ৮০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। একটি গরু দিনে যত কেজি দুধ দেয় তাকে তত কেজি দানাদার খাবার দিতে হয়। বর্তমানে এক কেজি গরুর খাবারের দাম পড়ছে ৫২ টাকা। দুধের দামের অর্ধেক গরুর খাবারের দাম না হলে এ ব্যবসায় পোষানো সম্ভব নয়। তার ওপরে গরুর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ওষুধের দামও অনেক বেড়েছে।’

দিনাজপুর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ড. আশিকা আকবর তৃষা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খামারিরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খামারগুলো নার্সিং, প্রশিক্ষণ, মোটিভেশন ক্যাম্পসহ বিভিন্ন উৎসাহমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রাণীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছে। কিন্তু বাজারে গরু বা ছাগলের খাবারের যে দাম তাতে খামারিরা পোষাতে পারছেন না। একই অবস্থা চিকিৎসাসামগ্রীর বেলায়ও। কিন্তু দুটো বিষয়ই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’

বিডিএফএর চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যে হারে খামারিরা ডেইরি ফার্ম থেকে বের হয়ে আসছে তাতে ভবিষ্যতে অনেক বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ গাভী কমে গেলে গরুর প্রজনন কমে যাবে। সাধারণত উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে সবক্ষেত্রেই দামের একটা সমন্বয় হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে দুধের দাম বেড়েছে সামান্যই।’

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কবিরুল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে গোচারণভূমি করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। নিউজিল্যান্ডে দেখেছি তারা দানাদার খাদ্য একেবারেই কম খাওয়ায়। আমাদের রাস্তার পাশে কিংবা অব্যবহূত জমিতে উচ্চফলনশীল ঘাসের আবাদ বাড়াতে হবে। আবার ধান গাছের অবশিষ্ট অংশ যথাযথভাবে কাটা হলে তাও গরুর খাবারের জন্য উপযোগী। এভাবে বিভিন্নভাবে খাবারের খরচ কমানো সম্ভব। এছাড়া উৎপাদন খরচ বিবেচনায় দুধের দাম সমন্বয় করতে হবে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাহিদ রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পশুখাদ্যের মূল্য হ্রাসের বিষয়ে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা তো একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও কৃষকরা ঋণ পাচ্ছেন না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা বসে নেই, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কীভাবে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দেয়া যায় সেটা নিয়েই আলোচনা চলছে।’

 

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন দিনাজপুর প্রতিনিধি আসাদুল্লাহ্ সরকার