গঙ্গা বা পদ্মা নদী গতি পাল্টিয়ে অনেক দক্ষিণে সরে গেলে পরিত্যক্ত ক্ষীণ ধারাটি বুড়িগঙ্গা নামে পরিচিতি পায়, যার রূপ দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েছিলেন মোগলরা। তাই ১৬১০ সালে এ নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে তোলেন ঢাকা নগরী। সেই নগরীকে আরেকটু রাঙিয়ে দিতে রাতে নদীর তীরে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেন মোগল সুবেদার মুকাররম খাঁ। ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তাছাড়া এক সময় নদীটিই ছিল স্থানীয়দের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু যন্ত্রচালিত শিল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে ফেলা হয়। পুরনো যৌবন হারিয়ে বুড়িগঙ্গা যেন আজ সত্যিই বুড়ি!
বুড়িগঙ্গার এমন অবস্থা দেখে নদীটিকে বাঁচাতে আন্দোলনে নামেন পরিবেশবাদীরা। নতুন করে ভাবতে শুরু করে সরকারও। পুরান ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নেয়া হয় চামড়া শিল্পকে, যা এক সময় সবচেয়ে বেশি দূষণ ছড়াত নদীর জলে। দূষণমুক্ত ও স্বচ্ছ পানির পরিকল্পনা নিয়ে সদরঘাটে বসানো হয় দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) বা পরিশোধনাগার। নগরবাসীকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উপহার হিসেবে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ এর উদ্বোধন করা হয়। যদিও প্রাথমিকভাবে পানি পরিশোধন শুরু হয়েছিল একটি প্লান্ট দিয়ে। সেটিও আবার সপ্তাহখানেক পর বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি আর চালুই করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আন্তরিকতার অভাবেই বেশি দূর এগোতে পারেনি স্বচ্ছ পানির বুড়িগঙ্গার স্বপ্ন।
জানা যায়, গ্রিন বার্ড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি করে বিআইডব্লিউটিএ। রাজধানীর ড্রেন হয়ে যে পানি বুড়িগঙ্গায় পড়ে, সেগুলো ট্রিটমেন্ট করার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রাথমিকভাবে দুটি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করার চুক্তি হয়। সফল হলে পরবর্তী সময়ে অন্য ড্রেনগুলোর মুখেও এ ধরনের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসানোর কথা ছিল।
চুক্তি অনুযায়ী ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু করা হলেও বেশিদিন সচল রাখা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পায়নি বলে অভিযোগ করেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের গবেষক ছিলেন রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ এজাজ। এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আসা পানি যেন শোধন করে বুড়িগঙ্গায় ফেলতে পারি, এজন্য প্রস্তাব ও ধারণা আমিই উত্থাপন করি। বিআইডব্লিউটিএ বিষয়টি আমলে নিয়ে গ্রিন বার্ডের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ শুরু করে। কিন্তু প্রকল্পটি পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ওই নদী গবেষক বলেন, আমাদের টার্গেট ছিল ড্রেনের নোংরা পানি পরিশোধন করে নদীতে ফেলা। আমরা সেটি করে দেখিয়েছি। নৌ প্রতিমন্ত্রী উদ্বোধনের পর এক সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যক্রম চলে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তাই কাজটি আর সামনে এগোয়নি।
সরেজমিন সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বছর আড়াই আগে তৈরি করা ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সদরঘাটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটি দুই বছর ধরেই বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তারা বলেন, শুরুর পরপর ড্রেন থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাপ নিয়ে পানি আসতে থাকে। পরে সংশ্লিষ্টরা আর এটি সামাল দিতে পারেনি।
বিষয়টি স্বীকার করে মোহাম্মাদ এজাজ বলেন, আমরা যে পরিমাণ চাপের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করি, বাস্তবে পানির চাপ আরো বেশি ছিল। তাছাড়া পানির সঙ্গে প্রচুর পলিথিন এসেও ড্রেনের মুখ আটকে দেয়। ময়লার পাশাপাশি বড় বড় বস্তা, ড্রাম, ঢোক, বালিশ, কম্বলের মতো ভারী ময়লাও চলে আসত পাইপ দিয়ে। ফলে এগুলো ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ সমস্যা সমাধানে আমরা দ্বিতীয় আরেকটি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করার প্রস্তাব দিই। কিন্তু সেটি করা সম্ভব হয়নি।
গ্রিন বার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ তাসনিম মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা প্রথমে পাঁচ ফুট গভীর করে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বানাই। পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে বলা হয়, এর গভীরতা ১৫ ফুট করার জন্য। তাদের কথামতো কাজ করার পর দেখি, ড্রেনের ময়লার কারণে পানি ঠিকভাবে ট্রিট হচ্ছে না। ফলে আরেকটি চেম্বারের প্রয়োজন দেখা দেয়।
তিনি অভিযোগ করেন, কাজটি করতে গিয়ে আমরা নানা বাধারও সম্মুখীন হই। দিনে কাজ করে যাওয়ার পর রাতে কারা যেন এসে অবকাঠামো ভেঙে ফেলে। কয়েকবার এমন হয়েছে। তার পরও আমরা বর্ধিত আকারে অবকাঠামোটি দাঁড় করাই। এভাবে আমাদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এ কাজে বিআইডব্লিউটিএর থেকে মাত্র ৪ লাখ টাকা পেয়েছিলাম। একটা পর্যায়ে টাকার সংস্থান না হওয়ায় আমরা সেখান থেকে চলে আসি। সহযোগিতা পেলে পুনরায় পরিশোধনাগার চালু করা সম্ভব জানিয়ে তাসনিম মাহমুদ বলেন, আমাদের চেম্বার এখনো সদরঘাটে আছে। বিআইডব্লিউটিএ বললে আবার পানি পরিশোধনের কাজ শুরু করতে পারব।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, পানি পরিশোধন প্রকল্পটি সফল না হওয়ায় আমরা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। তবে তারা (গ্রিন বার্ড) যদি এখনো সফলভাবে শুরু করতে পারে, আমরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করব।










