দেশের নৌপথগুলোর মধ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চাঁদপুর নৌরুট। প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী নৌরুটে যাতায়াত করেন। বিশেষ করে চাঁদপুর, হাইমচর, মতলব, শরীয়তপুর ও আশপাশের জেলা থেকে ঢাকায় যাতায়াতকারীদের জন্য এটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক নৌপথ। ঢাকা-চাঁদপুর রুটে বেশক’টি বিলাসবহুল লঞ্চ চালুর সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। তবে সে তুলনায় যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। এতে আগের তুলনায় কমেছে যাত্রীর সংখ্যা। কমেছে লঞ্চের সংখ্যাও।

যাত্রীরা বলছেন, ৫০ টাকার ভাড়া করা হয়েছে ৩০০ টাকা। কেবিনে জায়গা পেতে চাইলে সিঙ্গেল ৮০০ টাকা, ডাবল ১২০০-১৬০০ টাকা নেয়া হয়। নদীপথে চাঁদপুর-ঢাকা যাতায়াতে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগে। আর সড়কপথে সময় লাগে দুই-আড়াই ঘণ্টা। সড়কপথের তুলনায় নদীপথে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় যাত্রীরা নদীপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। নদীপথে যাতায়াত তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল, আরামদায়ক ও নিরাপদ। এজন্য দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌযান চালু ও সেবার মান বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে জেলা প্রশাসক। গতকাল চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে এ রুটে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৭৫০ জন যাতায়াত করেছে। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত যাতায়াত করেছে ১০ লাখ ৭ হাজার যাত্রী। গত বছর নৌরুটে লঞ্চ চলাচল করেছে ৬০টি। তবে চলতি বছর ঢাকায় গেছে ২৫টি লঞ্চ। আর ঢাকা থেকে এসেছে ৩০টি।

বিআইডব্লিউটির উপপরিচালক ও পোর্ট অফিসার মোহাম্মদ বশির আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লঞ্চগুলোতে সেবার মান আরো বাড়াতে হবে। সময় কমিয়ে আনতে পারলে যাত্রী বাড়বে।’

চাঁদপুর নৌবন্দরটি একসময় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে থাকলেও তিন নদীর মোহনা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া এবং ডাকাতিয়া নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে শহরের নিশি বিল্ডিং এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বর্তমানে তৈরি হচ্ছে আধুনিক নৌবন্দর। তবে আধুনিক নৌবন্দরের সঙ্গে নৌযানগুলোও আধুনিক হওয়া প্রয়োজন মনে করেন এ রুটের যাত্রীরা।

চাঁদপুর পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক দেলোয়ার আহমেদ বলেন, ‘এ রুটের লঞ্চগুলোর উন্নতি হয়নি। নিজেদের মতো করে পরিচালনা করছে। শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে এসির ভাড়া একই রকম নেয়। কিন্তু সেবার মান বাড়েনি।’

ফরিদগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সমাজকর্মী শিমুল হাসান বলেন, ‘ঢাকা-চাঁদপুর নৌরুটে ভ্রমণ খুবই চমৎকার। কিন্তু ৫০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা হলেও যাত্রীসেবার মান ভালো হয়নি। সেবার মান বৃদ্ধি হলে যাত্রী আরো বাড়বে।’

শিক্ষক ও লেখক আইরিন সুলতানা লিমা বলেন, ‘সড়কপথের চেয়ে লঞ্চে এখন সময় বেশি লাগে। সড়কপথে দুই-আড়াই ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছা যায়। সেখানে লঞ্চে সময় লাগে ৩-৪ ঘণ্টা। এ পদ্ধতির পরিবর্তন করে দ্রুতগামী নৌযান এখন সময়ের দাবি।’

বেশির ভাগ লঞ্চে নিম্নমানের আসন, অপ্রতুল লাইফ জ্যাকেট, অপরিষ্কার শৌচাগার ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সন্তোষজনক নয়। দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌযান চালুর বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন।

১৬ অক্টোবর দেয়া চিঠিতে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগের সব জেলা এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকাসহ সারা দেশের লঞ্চ, কার্গো ও জাহাজ চলাচলের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে চাঁদপুর নদীবন্দর ব্যবহৃত হয়। চাঁদপুর শহর পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত পাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন বলেন, ‘চাঁদপুর-ঢাকা নৌরুট সচল রাখার জন্য আমি মনে করি আধুনিক এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন লঞ্চ চালুর উদ্যোগ, লঞ্চগুলো সংস্কার, সেবার মান বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন প্রয়োজন। চাঁদপুর ছাড়াও শরীয়তপুর ও লক্ষ্মীপুরের কয়েকটি অঞ্চলের মানুষ নৌপথে ঢাকায় যাতায়াত করেন। সড়কের ওপরে চাপ কমাতে হলে জনপ্রিয় এ নৌরুটে সেবার মান বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে যাত্রীর অপ্রতুলতায় লঞ্চসেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’