ঢাকা থেকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত করতে হয় যমুনাপাড়ের জেলা সিরাজগঞ্জ হয়ে। পুলিশের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে এ জেলার ১২৪ কিলোমিটার মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৬টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮১ জন। অর্থাৎ গত বছর সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে প্রতি পাঁচদিনে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালক, বাঁক, অপ্রশস্ত সড়ক ও সেতু, ট্রাফিক আইন না মানা এবং ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং প্রবণতার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়ক ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-রংপুরের অবস্থান সিরাজগঞ্জে। এছাড়াও জেলাটিতে দুটি আঞ্চলিক মহাসড়ক রয়েছে। সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জে মোট মহাসড়ক আছে ১২৬ কিলোমিটার। এ জেলায় মোট সড়ক রয়েছে ৪০৪ কিলোমিটার। গত বছর এ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উভয়ই বেড়েছে।

হাইওয়ে পুলিশ ও বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সিরাজগঞ্জে ৫৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয় ১৫০ মানুষ। ২০১৯ সালে এ জেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২টি। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১১০ জনের। এছাড়া আহত হয়েছে দুই শতাধিক। এর মধ্যে গত বছর জেলায় মহাসড়কে ৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভোরে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের সলঙ্গা থানার হরিণচরা এলাকায় শ্যামলী পরিবহন বাসের সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়। এ সময় আহত হয় আরো ১০ জন।

বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ শহীদ আলম বলেন, জেলায় মহাসড়কে দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা উভয়ই বেশি। জেলার মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। সেই তুলনায় রাস্তার প্রশস্ততা কম। বেপরোয়া গাড়ি চালনা, ওভারলোডিং, ওভারটেকিং ও চালকদের ক্লান্তিভাব দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী।

তিনি জানান, ২০১৯ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থেকে হাটিকুমরুল সংযোগ সড়কের নলকা পর্যন্ত ১৬টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন মারা গেছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ২৭ জন। বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থেকে হাটিকুমরুল হয়ে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজ বাস্তবায়ন শেষ হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমে যাবে।

হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি আখতারুজ্জামান বলেন,

বঙ্গবন্ধু সেতুর সিরাজগঞ্জ অংশে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালনা, ট্রাফিক আইন না মানার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। ময়নাতদন্ত ও আইনি জটিলতার ভয়ে দুর্ঘটনার পর অনেকেই থানায় জানায় না। ফলে অনেক ঘটনা রেকর্ডই করা হয়নি।

জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাঁক রয়েছে, যার কারণে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখা যায় না। এছাড়া মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচলের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে।

ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) মিলাদুল হুদা বলেন, যানবাহনের চালকরা ট্রাফিক আইন মানতে চান না। তারা যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করেন ও বেপরোয়াভাবে চালান। তবে মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলতে দেয়া হয় না বলে দাবি করেন তিনি।

সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, রাস্তায় যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ থাকে। এ অবস্থায় চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে। দীর্ঘ পথ এবং দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব, সরু সেতু এবং বাঁকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি জানান, মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছে।

এ কাজ শেষ হলে বাঁক অনেকটা কমে আসবে। সব সেতু প্রশস্ত করা হচ্ছে। যানবাহন চলাচল হবে একমুখী। তখন জেলায় মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসবে।